ব্যাখ্যা
আমাদের প্রথম অংশে “প্রকাশিত বাক্য ০১ – লক্ষ্য করা” আমরা অনেক বিষয় লক্ষ্য করেছি। বাইবেলের যে কোনো পুস্তক আরো ভালভাবে বুঝতে হলে আমাদের পুস্তকটির ঐতিহাসিক পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যয়ন করতে হবে (এভাবে আমরা ফিলীমন, তীত, রোমীয় ও মার্ক অধ্যয়ন করে আসলাম)। কিন্তু প্রকাশিত বাক্যের ক্ষেত্রে তা আরো অনেক বেশি জরুরী: অধিকাংশ ‘মাথা খারাপ’ ধরণের ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, কারণ ঐতিহাসিক পরিস্থিতি অস্বীকার করে পুস্তকটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এরজন্য আমরা গুরুত্বের সঙ্গে এক একটি ব্যাখ্যা প্রশ্ন দিয়ে আগাব:
০১ ব্যাখ্যা প্রশ্ন প্রকাশিত বাক্য কে লিখেছেন?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ১:১, ১:৪, ১:৯ এবং ২২:৮ পদ পড়ুন। লেখক নিজের পরিচয় কিভাবে দেন?
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
- প্রকাশিত ১:১ “যীশুর দাস যোহন”
- প্রকাশিত ১:৪ “আমি যোহন”
- প্রকাশিত ১:৯ “আমি তোমাদের ভাই যোহেন, যীশুর সংগে যুক্ত হয়ে আমি তোমাদের সংগে একই কষ্ট, একই রাজ্য এবং একই ধৈর্যের ভাগী হয়েছি ।”
- প্রকাশিত ২২:৮ “আমি, যোহন এই সব শুনেছি ও দেখেছি।”
লেখক হলেন যোহন। তিনি নিজের পরিচয় আরো বিস্তারিতভাবে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। যোহন তার পাঠকদের মত একই রাজ্যের একই কষ্টের ও একই ধের্যের ভাগী।
আমরা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি যে এই যোহন হল যীশুর শিষ্য ও প্রেরিত যোহন, যাকোবের ভাই, সিবদিয়ের ছেলে, বজ্রধ্বনির পুত্র যোহন? দু’ট উত্তর দেওয়া যায়:
- যোহনের অন্যান্য লেখাগুলোর সাথে প্রকাশিত বাক্যে ব্যবহৃত ভাষার মিল (নিচের তালিকা দেখুন)।
- মণ্ডলীর আদিপিতাদের সাক্ষ্য যে প্রেরিত যোহন হলেন প্রকাশিত বাক্যের লেখক।
০২ ব্যাখ্যা প্রশ্ন প্রকাশিত বাক্য কাদের কাছে লেখা?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ১:৪, ১:১১, ২:১, ২:৮, ২:১২, ২:১৮, ৩:১, ৩:৭, ৩:১৪ পদ পড়ুন। লেখক কাদের জন্য পুস্তকটি লিখেছেন? একটি তালিকা বানান।
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
যোহন প্রকাশিত বাক্যে তার পাঠকদের “এশিয়ার সাতটি মণ্ডলী” (প্রকাশিত ১:৪) হিসাবে চিহ্নিত রাখেন: “ইফিষ, স্মূর্ণা, পর্গাম, থুয়াতীরা, সার্দ্দি, ফিলাদিলফিয়া ও লায়দিকেয়া” (প্রকাশিত ১:১১)। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, সাতটি মণ্ডলী এক একটা করে ব্যক্তিগত ছোট চিঠিও পায় (প্রকাশিত ২:১, ২:৮, ২:১২, ২:১৮, ৩:১, ৩:৭, ৩:১৪)।
“এশিয়া” ছিল রোম রাজ্যের এশিয়া মাইনর প্রদেশের একটি এলাকা। আজ তা আধুনিক তুরস্ক দেশে পড়ে। স্মূর্ণা শহরের আধুনিক নাম হল Izmir, তুরস্কের দ্বিতীয় জনবহুল শহর।
নির্দেশনা
মানচিত্রতে শহরগুলো খুঁজে বের করুন। উল্লিখিত সাতটি শহরের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করুন। কি চোখে পড়ে?
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
প্রকাশিত বাক্য হল একটি ঘুর্ণায়মান চিঠি, যা একটি পর একটি মণ্ডলীর কাছে গিয়েছিল। মণ্ডলীদের ধারাবাহিক উল্লেক থেকে বুঝা যায় চিঠিটি কিভাবে ঘুরেছিল।
আমরা পরে প্রত্যেক শহর সম্বন্ধে এবং প্রত্যেরটি মণ্ডলী সম্বন্ধে আরো তথ্য পাব।
কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন ওঠে: প্রকামিত বাক্য কি শেষ কাল সম্বন্ধীয় না? তা কি শেষকালীন লোকদের জন্য, অর্থাৎ আমাদের জন্য লেখা হয় নি? এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
০৩ ব্যাখ্যা প্রশ্ন প্রকাশিত বাক্য শেষকালীন লোকদেরদের জন্য লেখা!?
নির্দেশনা
নিচে দেওয়া শিক্ষা মনোযোগ সহকারে পড়ুন।
প্রচলিত ব্যাখ্যা
যারা লোকদেরকে উত্তেজিত করে তোলার মত শিক্ষা দেয় তারা সবাই দাবি করে যে, প্রকাশিত বাক্য শেষ কালের লোকদের উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ আমাদেরই উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে।
এটি বলে তারা এও দাবি করে যে, বিগত দুই হাজার বছর ধরে পুস্তকটির সত্যিকার অর্থে বুঝা সম্ভব ছিল না। তারা মনে করে প্রকাশিত বাক্য হল ‘সীলমোহর করে রাখা পুস্তক’, অর্থাৎ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেউ পুস্তকটি বোঝে নি। কিন্তু আমরা শেষ কালে আছি বলে এখন আমরাই বুঝি। তা-ই যদি মনে করি তবে এও বলতে হয় যে, লেখক যোহন নিজের কথা নিজেই বোঝেন নি, এশিয়ার ৭টি মণ্ডলী যাদের কাছে তিনি লেখেন, তারাও কিছু বোঝে নি। কিন্তু কিছু না বুঝে কেন তারা এই লেখা কষ্ট করে সংরক্ষিত করে রেখেছে? কেন যীশু তাদের জন্য এমন একটি লেখা পাঠিয়েছেন, যা তাদের কাছে কোন অর্থ প্রকাশ করে নি এবং তাদের কঠিন পরিস্থিতিতে সাহায্যও করে নি?
যারা প্রকাশিত বাক্য এভাবে ব্যাখ্যা করে তারা পুস্তক থেকে এমন কথা বা বিষয় খুঁজে বের করে, যা বর্তমান পৃথিবীর একটি ঘটনার সাথে মিল থাকে। উদাহরণ: তারা দাবি করে যে, বাইবেলের এই কথা অমুখ আধুনিক রাজনৈতিক নেতাকে বুঝায় অথবা তমুখ জাতি বা বর্তমান ঘটনা বুঝায়। এভাবে যদি একটি পদ ব্যাখ্যা করি তবে আমরা এও দাবি করি যে, আগের পাঠকেরা (যারা এই বর্তমান রাজনৈথিক নেতা সম্বন্ধে জানত না) তাদের জন্য পদটি ঠিকমত বুঝা সম্ভব ছিল না। তাই দুই হাজার বছর ধরে পাঠকেরা সব ভুল বুঝছে। কিন্তু আমরা – এবং শুধুমাত্র আমরাই! – তা এখন ঠিকমত বুঝি। এই ধরণের কথায় অহংকার প্রকাশ পায় এবং তা উপযক্ত মতবাদ নয়।
কেন অনেকে প্রকাশিত বাক্য এভাবে ব্যাখ্যা করে? কারণ হল যে তারা মনে করে, বাইবেলে এমন পদ আছে যা তাদের এই ব্যাখ্যা সমর্থন করে, যেমন দানিয়েল ১২:৮-৯: “এই সবের শেষ ফল কি হবে?” উত্তরে তিনি বললেন, “দানিয়েল, তুমি এই বিষয় নিয়ে আর চিন্তা কোরো না, কারণ শেষ সময় না আসা পর্যন্ত এই সব কথা বন্ধ করে সীলমোহর করে রাখা হয়েছে”। এই ধরণের পদ পড়ে তারা মনে করে যে, প্রকাশিত বাক্য হল একটি ‘সীলমোহর করে রাখা পুস্তক’ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেউ বোঝে নি। কিন্তু আমরা এখন শেষ কালে আছি বলেই আমরা তা বুঝতে পারি।
যদি প্রকাশিত বাক্য এভাবে ‘সীলমোহর করে রাখা পুস্তক’ হিসাবে বোঝানো হয়, তাহলে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়: বিভিন্ন প্রচারক এই চিন্তার ভিত্তিতে অংক করে যীশুর দ্বিতীয় আগমনের তারিখ ঘোষণা করেছেন অথবা “খ্রীষ্টারী” কাকে বুঝায়, তাও ঘোষণা করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ব্যাখ্যা ভুল হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভুল ঘোষণার তালিকা বেশ লম্বা: “খ্রীষ্টারী” হিসাবে ঘোষিত হয়েছে: সম্রাট নীরো, সম্রাট ডোমিটিয়ান, মুহাম্মাদ, মার্টিন লুথার, ক্যাথলিক পোপ, হিটলার, স্টালীন, ব্রেষ্নেভ, সাদ্দাম হোসেন, পুটিন ইত্যাদি। যীশুর দ্বিতীয় আগমনের ভুল তারিখের তালিকাও বেশ লম্বা: ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দ, ১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দ, আমাদের যুগে ৮ অগষ্ট ১৯৮৮, ২০০০ সাল, ২০১২ সাল … প্রত্যেকবার বিশ্বাসীদের মধ্যে উত্তেজনা ও ভয়ের একটি ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে, প্রত্যেক ঘোষিত তারিখের পিছনের বাইবেল থেকে প্রমাণ দেখানো হয়েছে – কিন্তু প্রত্যেক তারিখ মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, প্রকাশিত বাক্য ‘সীলমোহর করে রাখা পুস্তক’ মনে করলে ভাল কোনো মতবাদ তৈরি হয় না!
আসলে ‘সীলহোমর করে রাখা পুস্তক’ হল এমন একটি চিন্তা যা দাবি করে যে, বিশ্বাসীদের ‘বিশেষ জ্ঞান বা প্রকাশ’ দরকার, তাই শুধুমাত্র কিছু বিশ্বাসীরা এটা বুঝতে সক্ষম হবে। কিন্তু অন্যদের নিয়ে কি হবে? নতুন নিয়ম আমাদের এই ধরণের শিক্ষা নিয়ে সাবধান করে। বিশেষভাবে পৌল প্রায়ই জোর দিয়ে বলেন যে, বিশ্বাসীদের যা জানা দরকার তা সবার কাছে প্রকাশিত হয়েছে, অল্প মাত্র বিশ্বাসীদের বিশেষ জ্ঞান যে থাকবে, এমন নয় (ইফিষীয়, কলসীয়)।
তা ছাড়া লক্ষ্য করুন: প্রকাশিত বাক্য পুস্তক নিজের সম্বন্ধে নির্দিষ্টভাবে বলে যে, পুস্তকটি সীলমোহর করে রাখা চলবে না: “এই বইয়ের সমস্ত কথা, অর্থাৎ ঈশ্বরের বাক্য তুমি গোপন রেখো না, কারণ সময় কাছে এসে গেছে” (প্রকাশিত ২২:১০)। দেখা যায় যে, যোহন মনে করতেন, তার পাঠকেরা পুস্তকটি অবশ্যই বুঝবে। পুস্তকটি তাদের হাতে থাকুক, খোলা থাকুক কারণ “সময় কাছে এসে গেছে”।
তবে প্রকাশিত বাক্য কিভাবে বুঝব?
তবে প্রকাশিত বাক্য কিভাবে বুঝব? কিভাবে ব্যাখ্যা করব? যেভাবে আমরা বাইবেলের প্রত্যেকটি পুস্তক ব্যাখ্যা করি, ঠিক তেমনি প্রকাশিত বাক্যও আমাদের ব্যাখ্যা করা দরকার। বাইবেলের প্রত্যেকটি পুস্তক (পুরাতন নিয়ম হোক বা নতুন নিয়ম হোক) একটি নির্দিষ্ট যুগে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবিস্থত লোকদের জন্য লেখা হয়েছিল এবং পুস্তকটি তাদের পরিস্থিতির বিষয়ে ঈশ্বরের দৃষ্টি দেখাতে চেয়েছিল। তাই পুস্তকটি বুঝতে গেলে সেই পাঠকদের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করে তা বুঝতে হবে। কিন্তু একই সময়ে বাইবেলের প্রত্যেকটি পুস্তক হল পবিত্র আত্মা দিয়ে লিখিত ঈশ্বরের অনন্ত বাক্য যা প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেকজনের জন্য প্রযোজ্য। তাই প্রত্যেকটি পুস্তক আমাদের কাছেও লেখা হয়েছে ও আমাদের কাছেও কথা বলে – এবং প্রকাশিত বাক্য ঠিক তেমনি। তাই প্রথমে আমাদের প্রকাশিত বাক্যের লেখক ও পাঠকদের ঐতিহাসিক পরিস্থতি বুঝতে হবে এবং এভাবে আমরা আমাদের যুগের জন্য উপযুক্ত প্রয়োগ পাব।
০৪ ব্যাখ্যা প্রশ্ন পাঠকদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি কেমন ছিল?
নির্দেশনা
ইতিমধ্যে আমরা যোহনের কথা দেখলাম যে, লেখক এবং পাঠকেরা “একই কষ্ট, একই রাজ্য এবং একই ধৈর্যের ভাগী” (প্রকাশিত ১:৯)। কিন্তু ঐসময় কি ধরণের সমস্যা চলছিল? তা খুঁজের বের করার জন্য আমরা ৭টি মণ্ডলীর কাছে ৭টি ছোট ব্যক্তিগত চিঠিগুলো দেখব। নিচে দেওয়া পদগুলো বাইবেলে পড়ুন এবং চিন্তু করুন: মণ্ডলীটি কি ধরণের চাপরে সম্মুখীন? আত্মিক চাপ (হলুদ রং দেন)? রাজনৈতিক চাপ (লাল রং দেন)? অর্থনৈতিক চাপ (সবুজ রং দেন)? অথবা নির্দিষ্টভাবে বলা হয় নি (নীল রং দেন)।
- ইফিষ প্রকাশিত ২:১-৭
- স্মূর্ণা প্রকাশিত ২:৮-১১
- পর্গাম প্রকাশিত ২:১২-১৭
- থুয়াতীরা প্রকাশিত ২:১৮-২৯
- ফিলাদিলফিয়া প্রকাশিত ৩:৭-১৩
- সার্দি ও লায়দিকেয়া কোনো চাপ উল্লেখ করা হয় নি
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
শুধুমাত্র এমন পদ দেখানো হয়েছে যেখানে চাপের উল্লেক পাওয়া যায়:
ইফিষ
“২ … আমি জানি তুমি মন্দ লোকদের সহ্য করতে পার না, আর যারা প্রেরিত্ না হয়েও নিজেদের প্রেরিত্ বলে দাবি করে তাদের পরীক্ষা করে দেখেছ এবং তারা যে মিথ্যাবাদী তার প্রমাণও পেয়েছ। ৩ তোমার ধৈর্য আছে এবং তুমি আমার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেছ, ক্লান্ত হয়ে পড় নি। … ৬ তবে এই একটা গুণ তোমার আছে যে, নীকলায়তীয়েরা যা করে তা তুমি ঘৃণা কর, আর আমিও তা ঘৃণা করি।”
স্মূর্ণার
“৯ তোমার কষ্ট ও অভাবের কথা আমি জানি, কিন্তু তবুও তুমি ধনী। নিজেদের যিহূদী বললেও যারা যিহূদী নয় বরং শয়তানের দলের লোক, তারা তোমার বিরুদ্ধে যা বলে তা আমি জানি। ১০ তুমি যে সব কষ্ট ভোগ করতে যাচ্ছ তাতে মোটেই ভয় পেয়ো না। শোন, শয়তান তোমাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরীক্ষা করবার জন্য জেলে দেবে, আর দশ দিন ধরে তোমরা কষ্ট ভোগ করবে।“
পর্গাম
“১৩ তুমি কোথায় বাস করছ তা আমি জানি; সেখানে শয়তানের সিংহাসন আছে। তবুও তুমি আমার প্রতি বিশ্বস্ত আছ এবং আমার উপর তোমার বিশ্বাসকে অস্বীকার কর নি। এমন কি, যেখানে শয়তান বাস করে সেখানে যখন আমার বিশ্বস্ত সাক্ষী আন্তিপাস্ তোমাদের সামনে খুন হয়েছিল তখনও তুমি তোমার বিশ্বাসকে অস্বীকার কর নি। ১৪ কিন্তু তবুও তোমার বিরুদ্ধে আমার কিছু বলবার আছে। তোমার ওখানে এমন লোকেরা আছে যারা বিলিয়মের শিক্ষা অনুসারে চলে। বালাক রাজাকে বিলিয়ম শিক্ষা দিয়েছিল যেন সে প্রতিমার সামনে উৎসর্গ করা খাবার খাওয়া ও ব্যভিচার করবার মধ্য দিয়ে ইস্রায়েলীয়দের পাপের দিকে নিয়ে যায়। ১৫ তা ছাড়া নীকলায়তীয়দের শিক্ষা অনুসারে যারা চলে এমন কয়েকজনও তোমার ওখানে আছে।“
থুয়াতীরা
“১৯ আমি তোমার কাজ, তোমার ভালবাসা, তোমার বিশ্বাস, তোমার সেবা এবং তোমার ধৈর্যের কথা জানি। … ২০ তবুও তোমার বিরুদ্ধে আমার এই কথা বলবার আছে যে, তুমি ঈষেবল নামে সেই স্ত্রীলোকের অন্যায় সহ্য করছ। এই ঈষেবল নিজেকে নবী বলে। তার শিক্ষার দ্বারা সে আমার দাসদের ভুলায় যেন তারা ব্যভিচার করে এবং প্রতিমার কাছে উৎসর্গ করা খাবার খায়। ২৪ তোমরা যারা সেই শিক্ষামত চল না এবং যাকে শয়তানের সেই গভীর শিক্ষা বলা হয় তা জান না, যা তোমাদের আছে, আমি না আসা পর্যন্ত তা শক্ত করে ধরে রাখ।”
ফিলাদিল্ফিয়া
“৮ … আমি জানি তোমার শক্তি খুবই কম, কিন্তু তবুও তুমি আমার বাক্য পালন করেছ এবং আমাকে অস্বীকার কর নি। ৯ যারা নিজেদের যিহূদী বলে অথচ যিহূদী নয়, শয়তানের দলের সেই মিথ্যাবাদী লোকদের আমি তোমার কাছে আনাব এবং তোমার পায়ে প্রণাম করাব, আর তাদের জানিয়ে দেব যে, আমি তোমাকে ভালবাসি। ১০ ধৈর্য ধরবার যে আদেশ আমি দিয়েছিলাম তা তুমি পালন করেছ; সেইজন্য এই পৃথিবীর উপরে যে কষ্টের সময় আসছে সেই সময় থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করব।”
সারাংশে বলা যায় যে, ৭টি মণ্ডলী নিজেদেরকে অনেক চাপের মধ্যে খুঁজে পায়:
- আত্মিক চাপ: যেমন নতুন নিয়মে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় স্থানীয় যিহূদীরা প্রায়ই মণ্ডলীগুলোর উপরে চাপ প্রয়োগ করত, বিশেষভাবে স্মূর্ণা ও ফিলাদেলফিয়া মণ্ডলীতে। তা ছাড়া সাধারণ সংস্কৃতির বিভিন্ন ধরণের দেবতাপূজা থেকে মণ্ডলীদের উপর চাপ আসত, বিশেষভাবে পর্গাম ও থুয়াতীরা মণ্ডলীতে। তা ছাড়া মণ্ডলীর মধ্যে ভ্রান্ত শিক্ষা ছিল আর একটি বড় চ্যলেঞ্জ, বিশেষভাবে ইফিষ এ থুয়াতীরা মণ্ডলীতে। ভ্রান্ত শিক্ষা অনেকটা ছিল নস্টিসিসম (Gnosticism) ধরণের এবং যোহন তার অন্যান্য লেখায় এর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন (যোহন লিখিত সুসমাচার, ১,২,৩ যোহন)।
- অর্থনৈতিক চাপ: অর্থনৈতিক চাপ বিশেষভাবে স্মূর্ণা মণ্ডলীর ক্ষেত্রে উল্লিখিত এবং সম্ভবত তা হল থুয়াতীরার বিশ্বাসীদের আপোষের পিছেন একটি কারণ। ঐযুগে পেশাগুলো বানিহ্য সম্প্রদায় হিসাবে সাজানো ছিল এবং প্রত্যেকটি পেশার একটি সুরক্ষাকারী দেবতা ছিল। কাজের বা ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সেই দেবতার মন্দিরে করা হত এবং প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানে প্রায়ই দেবতা পূজায় উৎসর্গ করা মাংস খাওয়া এবং মন্দিরের পতিতাদের সাথে ব্যভিচার করা হত। বিশ্বাসীরা যদি এসব থেকে দূরে থাকত তবে এর অর্থ ছিল অর্থনৈতিক ও পেশাগত ক্ষতি এবং নিজের সমাজ থেকে বাদ পড়া।
- রাজনৈতিক চাপ: যীশু এই সাতটি চিঠিতে বলেন যে স্মূর্ণার মণ্ডলী অত্যাচারিত হবে এবং কিছু বিশ্বাসীদের জেলে যেতে হবে। তিনি আরো বলেন যে পর্গাম মণ্ডলীতে ইতিমধ্যে আন্তিপাস নামে একজন শহীদ হয়েছেন (প্রকাশিত ২:১৩)। কিন্তু কিভাবে খ্রিষ্টান বিশ্বাসীরা রোমীয় সরকারের চোখে রাষ্ট্রীয় শত্রুতে পরিণত হয়েছে?
০৫ ব্যাখ্যা প্রশ্ন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির একটি বিষেশ বিষয়: সম্রাট পূজার আগমন
নির্দেশনা
নিজে দেওয়া তথ্য পড়ুন এবং চিন্তা করুন, ৭টি মণ্ডলীর কাছে সেই ৭টি চিঠির সাথে কি কি মিল পাওয়া যায়:
রোম যখন গনতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্র হয়ে গিয়েছিল এবং সম্রাটদের ক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পেল, তখন রোমীয়রা সম্রাটদের দেব হিসাবে পূজা করতে লাগল।
- প্রথম সম্রাট জুলিয়াস কৈসরকে (৪৮-৪৪ খ্রীঃপূঃ) কিছু লোক স্বেচ্ছায় পূজা করতে শুরু করে, বিশেষভাবে তার মৃত্যুর পরে।
- সম্রাট আগস্ত (২৭ খ্রীঃপূঃ – ১৪ খ্রীঃ) নিজের জন্য ‘ঈশ্বরের পুত্র’ ও ‘শান্তিরাজ’ এই উপাধী দাবি করেন।
- সম্রাট কালিগুলা (৩৭-৪১ খ্রীঃ) প্রথম সম্রাট যিনি নিজের পূজা দাবি করেন এবং নিজের মূর্তি পূজার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মন্দিরে স্থাপন করেন।
- সম্রাট নীরো (৫৪-৬৮ খ্রীঃ) নিজেকে ‘ঐশ্বিক’ হিসাবে ঘোষণা করেন।
- কিন্তু সম্রাট ডোমিটিয়ান (৮১-৯৬ খ্রীঃ) হলেন সেই সম্রাট যিনি নিজের পূজা সারা রোম রাজ্যে দাবি করেন। শহরে শহরে সম্রাটের উদ্দেশ্যে মন্দির তৈরি হয় যেখানে রোম রাজ্যের সব নাগরিকদের সম্রাট পূজায় বাধ্য করা হয়। সম্রাট পূজা না করা মানে রোম রাজ্যের আইন অমান্য করা, রাষ্ট্রীয় শত্রুতে পরিণত হওয়া এবং সরকারকতৃক অত্যাচারিত হওয়া। রোমীয়দের জন্য নতুন কোন দেবতাকে পূজা করা বড় ব্যাপার নয় কিন্তু খ্রিষ্টানরা নিজেকে খুব বিপজ্জনক অবস্থায় খুঁজে পায়। মণ্ডলীর বিরুদ্ধে রোম শহরে নীরোর অত্যাচার ছিল অত্যন্ত হিংস্র (৬৪-৬৮ খ্রীঃ), কিন্তু তা ছিল স্থানীয় অত্যাচার এবং কয়েক বছর মাত্র। কিন্তু সম্রাট পূজার চাপ থেকে বিশ্বাসীরা কোথায় পালাবে? রোমীয় সাম্রাজ্যের বাইরে বাস করার মত স্থান আছে, মানুষ তা বুঝত না – এবং সারা রোম রাজ্যে সম্রাট পূজা দাবি করা হত।
বিশেষভাবে স্মূর্ণা ও ফিলাদিলফিয়া ছিল এমন শহর যা খুব তাড়াতাড়ি এবং আগ্রহের সঙ্গে সম্রাট পূজা গ্রহণ করেছিল। তাই শুরু থেকে এই শহর দু’টি সম্রাট পূজার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সারা এশিয়া মাইনর প্রদেশে সম্রাট পূজার উদ্দেশ্য দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল স্মূর্ণা শহরে। তাই এশিয়া মাইনরের সব মণ্ডলীর উপর, কিন্তু বিশেষভাবে স্মূর্ণা মণ্ডলীর উপরে সম্রাট পূজার চাপ ছিল।
০৬ ব্যাখ্যা প্রশ্ন বিশ্বাসীরা যখন অত্যাচারের সম্মুখীন হয়
নির্দেশনা
যখন বিশ্বাসীদের উপর এই ধরণের চাপ বা অত্যাচার আসে তখন তাদের হৃদয়ে কি ধরণের আবেগ এবং মনে কি ধরণের প্রশ্ন আসতে পারে? যখন না চেয়ে আমি রাষ্ট্রীয় শত্রু ও অপরাধী হয়েছি, যখন সরকার অতি শক্তিশালী ও বিরুদ্ধীয়, যখন সরকার থেকে পালানোর কোন উপায় দেখি না, যখন প্রথম বিশ্বাসীরা শহীদ হয়েছেন তখন কি চিন্তা বা সন্দেহ আসেতে পারে? কিছুটা লিখে রাখুন। খুব বাস্তবভাবে চিন্তা করুন!
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
বিশ্বাসীরা এই ধরণের প্রশ্ন বা সন্দেহে ভুগবে:
- আমার জীবনের উপর ক্ষমতা কার? কে আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে? সম্রাট ডোমিটিয়ান যদি আমার জীবন ধ্বংস করেত পারে তবে তিনি কি যীশুর চেয়ে শক্তিশালী নন? যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান তবে কেন তিনি এই অত্যাচার থামান না? তাঁর কি ক্ষমতা নেই? তবে তা হল তিনি কি ধরণের ঈশ্বর?
- ক্ষমতা থাকলে কেন তিনি কিছু করেন না? তিনি কেন এটা ঘটার অনুমতি দেন? ঈশ্বর কি আমাদের উপর অসন্তুষ্ট? তিনি কি আমাদের বিচার করছেন? আমাদের দোষই বা কি? এটা কিসের শাস্তি? তিনি কি আমাদের পরিত্যাগ করেছেন? তিনি কি আমাদের ভুলে গেছেন? তিনি কি আমাদের ভালবাসেন না?
- যদি ঈশ্বরের ক্ষমতা নেই, বা কিছু করার ভালবাসা নেই তবে তার জন্য কেন অত্যাচারিত হব? যদি সাহায্য না করেন তবে কেন তাঁকে আরাধনা করব? তাহলে লাভ কি? তাহলে পরিত্রাণ মানে কি? তাহলে ঈশ্বরের জন্য কেন জীবন দেব? আমি কি মিথ্যায় বিশ্বাস করেছি?
- যারা মারা যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে কি হবে? শহীদরা কোথায়? ঈশ্বর তাদের কি উদ্ধার করবেন? তারা কি ঈশ্বরের অসন্তোষের কারণে মারা গেছে? যীশু কেন ফিরে আসেন না যেমন বলেছেন? আর কত দিন?
ঠিক এই প্রশ্ন ও সন্দেহগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্যই প্রকাশিত বাক্য লেখা হয়েছে! এই বিষয়ে আরো আলোচনা করা হবে।
০৭ ব্যাখ্যা প্রশ্ন প্রকাশিত বাক্যের বড় ছবি তাহলে কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য লেখার উদ্দেশ্য হল ঠিক এই সন্দেহ ও প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া
যখন মণ্ডলী এত কষ্টের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায় তখন তার কি জানা প্রয়োজন? প্রকাশিত বাক্য ঠিক এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য কথা বলে: ঈশ্বরই সর্বশক্তিমান। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর মত আর কেউ নেই। তুমি মিথ্যা বিশ্বাস কর নি। যদিও অন্য রকম লাগে তবুও যা ঘটে তার কোন কিছুই ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছু ঘটে না। তোমার কষ্টভোগ অর্থহীন, তা নয়। ঈশ্বর সব কিছু উদ্ধারের দিকে নিয়ে আসতে জানেন। সম্রাটের ক্ষমতা আসলে কিছুই নয়, তুমি তার সামনে অসহায়, তা নয়। ঈশ্বর সব কিছুই দেখেন, তিনি সব কিছুই জানেন। তিনি প্রত্যেক অন্যায়ের বিচার করবেন। এক দিন তিনি প্রত্যেক অন্যায় ও মন্দ কাজের বিচার করবেন এবং সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবেন – মন্দ আত্মা ও মন্দ মানুষকে। ঈশ্বরই ন্যায্য। ঈশ্বরই ন্যায় বিচারক। একদিন তিনি সব কিছু ঠিক করে দেবেন এবং নতুন করে দেবেন। মৃত্য শেষ কথা নয়। অনন্ত জীবন বাস্তব। যারা শহীদ হয়েছেন তারা তাঁরই সামনে আছেন। এমন নয় যে তারা দোষ করেছে বরং তারাই বিশ্বস্ত, তারাই ঈশ্বরকে তাদের জীবন ও মৃত্যু দিয়ে গৌরবান্বিত করেছেন এবং তারাই তাঁর বিশেষ যত্নে আছেন। ঈশ্বর তাদের ভালবাসেন, তোমাকেও ভালবাসেন। এমন নয় যে ঈশ্বর তোমাকে নিয়ে অসন্তুষ্ট অথবা তোমাকে ত্যাগ করেছেন। তুমি তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত হও, যাই আসুক না কেন। ঈশ্বর মৃত্যু ও অনন্ত জীবনের কর্তা। যেমন যীশু তাঁর জীবন দিয়েছেন এবং জবাই করা মেষ-শিশু হয়েছেন, ঠিক তেমনি তুমি তাঁর প্রতি বাধ্য হও। যীশুই যোগ্য। যীশুই সেই জীবনদানকারী মেষ কিন্তু তিনিও সেই গর্জন করা সিংহ, সেই জয়ী যোদ্ধে, যিনি দয়ায় ও ন্যায্যতায় চিরকাল রাজত্ব করবেন। তিনি তোমাকে লজ্জিত হতে দেবেন না, তিনি তোমাকে জীবন মুকুট দান করবেন (প্রকাশিত ২:১০)।
প্রকাশিত বাক্য শক্তিশালীভাবে অত্যাচারিতদের প্রশ্ন ও সন্দেহের উত্তর দেন, তাদেরকে আশা, স্থিরতা ও সাহস দান করেন। শুধুমাত্র একটি প্রশ্ন উত্তর পায় না: “আর কত দিন?”। অদ্ভুত বিষয় যে অনেক আধুনিক পাঠক প্রকাশিত বাক্য থেকে ঠিক সেই উত্তর বের করতে চায় যা প্রকাশিত্য বাক্য দিতে চায় না! অনেকে প্রকাশিত বাক্য থেকে ‘শেষ কালের ঘটনার সময় তালিকা’ পেতে চায় এবং বিশেষভাবে যীশুর দ্বিতীয় আগমনের তারিখ জানতে চায়। কিন্তু প্রকাশিত বাক্য লেখা হয় নি শেষকাল সম্বন্ধীয় কৌতুহল মেটানোর জন্য বরং লেখা হয়েছে আমাদের জানানোর জন্য সর্বশেষে কি বাস্তবতা টিকে থাকবে।
প্রকাশিত বাক্য অত্যাচারিত মণ্ডলীকে এমন একটি দৃষ্টি দিতে চায় যাতে তাদের স্থিরতা, বিশ্বাস, সহ্য করার শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি পায়। এইটা হল এই পুস্তক লেখার উদ্দেশ্য। যদি আমরা পুস্তকটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করি যে বিশ্বাসীরা ভয় পায় তবে আমরা ভুল ব্যাখ্যা করছি।
০৮ ব্যাখ্যা প্রশ্ন প্রকাশিত বাক্য কি ধরণের সাহিত্ব?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ১:৪-৯ এবং ২২:২১ পদ পড়ুন। এখানে কি ধরণের কথা বা কাঠামো দেখা যায়? আর কোথায় এই একই ধরণের কথা বা কাঠামো দেখেছেন?
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
যেমন নতুন নিয়মের অধিকাংশ চিঠিতে দেখা যায় (যেমন পৌলের সমস্ত চিঠি) এখানে প্রথম লেখক নিজের পরিচয় এবং তার পাঠকদের পরিচয় দেন (প্রকাশিত ১:৪)। পরবর্তীতে একটি আশীর্বাদ (প্রকাশিত ১:৪-৫) এবং একটি প্রার্থনা (প্রকাশিত ১:৫-৮) দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত ১:৯ থেকে আসল লেখা শুরু এবং প্রকাশিত ২২:২১ পদে লেখক চিঠিটি একটি আশীর্বাদ দিয়ে সমাপ্ত করেন।
প্রকাশিত বাক্যের মৌলিক কাঠামো তাই নতুন নিয়মে অন্যান্য চিঠির মত। তাছাড়া প্রকাশিত বাক্য ২ ও ৩ অয়্যায়ে প্রত্যেকটি মণ্ডলীকে একটি ছোট ব্যক্তিগত চিঠি দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ১:৩ এবং ২২:১৮-১৯ পদ কেরী অনুবাদে পড়ুন। এখানে প্রকাশিত বাক্য পুস্তক হিসাবে নিজেকে কিভাবে বর্ণনা করে?
খুঁজে কি কি পাওয়া যায়
প্রকাশিত বাক্য নিজেকে “ভাববাণী” বলে। এবং তা-ই তো, আমরা প্রকাশিত বাক্য ভবিষ্যৎ সম্বন্ধীয় লেখা হিসাবে বুঝি। পৌল ১ করিন্থীয় ১৪:৩ পদে দাবি করেন যে ভাববাণী বললে তা লোকদের “গড়ে তোলে এবং উৎসাহ ও সান্ত্বনা দেয়”। অনেকে কিন্তু প্রকাশিত বাক্য এমনভাবে ব্যাখ্যা করে, যাতে ঠিক বিপরীত ঘটে: লোকেরা ভয় পায় এবং দ্বিধাদ্বন্ধে ও নিরাশায় পড়ে। ধরে রাখুন: প্রকাশিত বাক্য – ভাববাণী হিসাবে – গড়ে তোলার এবং উৎসাহ ও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছে। প্রকাশিত বাক্যের ভয়ংকর ব্যাখ্যা হল ভুল ব্যাখ্যা।
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ১:১ কেরী অনুবাদে পড়ুন। এখানে পুস্তকটির বর্ণনা কিভাবে দেওয়া হয়েছে?
বিবেচনা করুন
পুস্তকটি হল “প্রকাশিত বাক্য” (বাংলা) অথবা ইংরেজীতে Revelation। গ্রীক ভাষায় যোহন এখানে যে শব্দ ব্যবহার করেন, তা হল ‘ἀποκάλυψις’ (G602), বাংলা অক্ষর দিয়ে দেওয়া ‘এ্যপোকালুপ্সিস্’ অথবা ইংরেজীতে ‘Apocalypse’।
এই শব্দ বিশেষভাবে ইংরেজীতে খুব নেতিবাচক ও ভয়ংকর স্বাদ পেয়েছে। উদাহরণ: হলিউডের একটি ভয়ংকর ফিলেম (1979), নাম: ‘Apocalypse now’।
কিন্তু আসলে গ্রীক শব্দ ‘এ্যপোকালুপ্সিস্’-এর কোনো নেতিবাচক স্বাদ নেই, তা ভয়ংকরও না। শব্দের অর্থ হল “প্রকাশ করা, পরিষ্কারভাবে দেখানো, পরদা সরানো, গোমটা উঠানো”। তাই প্রকাশিত্য বাক্য হওয়ার কথা না রহস্যজনক, গোলমাল লাগার মত একটি ভয়ংকর গুপ্ত জ্ঞান বরং তার বিপরীত: প্রকাশিত বাক্য কিছুটা পরিষ্কারভাবে দেখাতে চায়।
কিন্তু ঠিক কি পরিষ্কারভাবে দেখায়? অথবা একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে বলা: প্রকাশিত বাক্য আসলে ঠিক কি প্রকাশ করে? এইটা অবশ্যই খুব গরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যার উত্তর দেওয়া হবে।
‘এ্যপোকালিপ্টিক’ ধরণের লেখা বাইবেলে বেশ কিছু পুস্তকে পাওয়া যায় (যেমন দানিয়েল ৭-১২) এবং বাইবেলের বাইরেও ঐযুগের বেশ কয়েকটি পুস্তক আছে যাতে এই লেখার ধরণ ব্যবহৃত।
এ্যপোকালিপ্টিক লেখার ধরণ
এ্যপোকালিপ্টিক লেখার ধরণ উভয় বাইবেলের বাইরে এবং বাইবেলের কয়েকটি পুস্তকে ব্যবহৃত। এ্যপোকালিপ্টিক লেখার উদ্দেশ্য হল অত্যচারিত পাঠকদের উৎসাহ দান। এ্যপোকালিপ্টিক লেখা একটি বড় যুদ্ধ দেখায়: মন্দ ভালর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কিন্তু অবশেষে মন্দকে বিচার করা হবে এবং অত্যাচারিতদের উদ্ধার করা হবে। মন্দ পরাজিত হবে, ভাল জয়লাভ করবে। এ্যপোকালিপ্টিক লেখার ধরণ অনেক চিহ্ন, ছবি, দর্শন, স্বপ্ন, সংখ্যা, জন্তু ও রূপক ব্যবহার করে। কিছু ঘটনা, যেমন বিদ্যুৎ চমকানো, শিলা বৃষ্টি, ভুমিকম্প, তারা পড়ে যাবে ইত্যাদি এসব ঈশ্বরের ক্ষমতা অথবা বর্ণিত ঘটনার গুরুত্ব দেখায়।
এ্যপোকালিপ্টিক লেখার ধরণে চিহ্ন, ছবি, জন্তু বা সংখ্যা রূপক অর্থে ব্যবহৃত। সংখ্যাগুলো পরিসংখ্যান বা অংকের বিষয় নয় বরং রূপক অর্থ প্রকাশ করে। যেমন ‘এক হাজার বছর’ মানে ‘অনেক দিন’ এবং ‘তিন ভাগ’ মানে ‘একটি বড় অংশ’। সংখ্যার রূপক অর্থের আরো বর্ণনা চাইলে, দয়া করে “প্রকাশিত বাক্য – বিস্তারিত অধ্যয়ন” দেখুন।
এ্যপোকালিপ্টিক লেখাগুলো অনেক সাজানো এবং তাতে একটি স্পষ্ট কাঠামো আছে, যার মাধ্যমে দেখানো হয় যে ঈশ্বর সব কিছুর উপরে রাজত্ব করেন, এমন কিছু নেই যা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কাঠামো থাকলেও এ্যপোকালিপ্টিক লেখা কিন্তু সময় অনুসারে সাজানো নয়, বরং একই বিষয় কয়েক বার একটু ভিন্নভাবে দেখানো হয়। লেখাটি পুনাবৃত্তিমূলক এবং চক্রাকারে চলে, যেমন: প্রকাশিত বাক্য ১১:১৫-১৬ পদ পড়লে বোধ হয় যে তা হল শেষ অবস্থার একটি বর্ণনা: “তখন স্বর্গে জোরে জোরে বলা হল, “জগতের রাজ্য এখন আমাদের প্রভু ও তাঁর মশীহের হয়েছে। তিনি চিরকাল ধরে রাজত্ব করবেন”। কিন্তু ঠিক পরের পদগুলোতে (প্রকাশিত বাক্য ১২:৩-৪) আবার বিশৃঙ্খলা দেখা যায় “তারপর স্বর্গে আর একটা চিহ্ন দেখা গেল-আগুনের মত লাল একটা বিরাট দানব … তার লেজ দিয়ে সে আকাশের তিন ভাগের এক ভাগ তারা টেনে এনে পৃথিবীতে ছুঁড়ে ফেলে দিল … যে স্ত্রীলোকটির সন্তান হতে যাচ্ছিল দানবটা তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল যেন সন্তানের জন্ম হলেই সে খেয়ে ফেলতে পারে”। তাতে বুঝা যায় যে, এই পদগুলোতে আমরা নতুন একটি চক্রে আছি, অর্থাৎ শেষ অবস্থা দেখানোর পরে ফিরে গিয়ে আবার আগের একটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে। যদি প্রকাশিত বাক্য থেকে একটি ধারাবাহিক সময় তালিকা তৈরি করতে চান তবে অবশ্যই মাথা ঘুরবে!
এ্যপোকালিপ্টিক লেখার ধরণ বুঝতে চাইলে নিজেকে খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতে হারাবেন না। লেখাটি ভালভাবে বুঝতে চাইলে এক ধাপ পিছিয়ে সম্পূর্ণ ছবি একসাথে দেখুন। জিজ্ঞাসা করুন: সব মিলিয়ে দেখে এই ছবি শ্রোতাদের মধ্যে কি চিন্তা বা আবেগ সৃষ্টি করে?
আমরা “প্রকাশিত বাক্য ০৩ – মূল বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা” ইউনিটে এ্যপোকালিপ্টিক লেখা কিভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, তা আরো দেখাব।
০৯ ব্যাখ্যা প্রশ্ন ইফিষ (Ephesus) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ২:১-৭ পদ ইফিষ মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে ইফিষ শহর সম্বন্ধে এবং ইফিষীয় মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে।
বিবেচনা করুন
ইফিষ শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- ইফিষ শহর ছিল কায়ষ্টার নদীর মুখে একটি বন্দর শহর। একটি রোমীয় মহাসড়ক ইফিষ বন্দর থেকে পূর্বদিকে যায়। তাই ইফিষ ছিল পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বেচাকেনার কেন্দ্র।
- ইফিষ শহর রোম রাজ্যের অধীনে আসার পর তাকে ‘স্বাধীন রোমীয় নগর’-এর পদমর্যাদা ও সুবিধা দেওয়া হয়। রোমীয়রা এশিয়া প্রদেশের জন্য ইফিষকে তাদের সরকারী কেন্দ্র বানায়।
- নতুন নিয়মের আগে থেকে ইফিষ শহরের লোকসংখ্যা ছিল ৩.৩ লক্ষ, তাই ইফিষ ছিল একটি বড়, গুরুত্বপূর্ণ ও ধনী শহর। নিজের শহর নিয়ে তাদের বেশ গর্ব ছিল।
- ইফিষের চারিদিকে এলাকার বন কাটার কারণে (স্থাপত্য, জাহাজ তৈরী ও জ্বালানীর জন্য) ও অতিরিক্ত ছাগল পোষার কারণে পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হয়। ফলে কাইষ্টার নদীর নাব্যতা কমে যায় এবং পলির কারণে ইফিষ বন্দরের কাজে বেশ অসুবিধা দেখা দেয়। এই সব কারণে নতুন নিয়মের সময় ইফিষের গুরুত্ব কমতে থাকে।
- ইফিষের বন্দর বন্ধ হওয়ার কারণে এই শহরে পর্যটন সর্বোচ্চ আয় লাভকারী ব্যবসা হয়ে যায়, তাই মন্দিরের গুরুত্ব বাড়ে।
- ২৬৩ খ্রীঃ গথ্ নামে একটি জাতি ইফিষ শহর ও আর্টেমিস মন্দির ধ্বংস করে।
ইফিষ শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
- আর্টেমিস (গ্রীক) / ডিয়ানা (রোমীয়) নামে ইফিষে সবচেয়ে বিখ্যাত পূজা ও মন্দির ছিল । একটি ঐতিহ্য বলে যে যেখানে একটি উল্কা পড়েছিল (প্রেরিত ১৯:৩৫) ঠিক সেই স্থানে মন্দির স্থাপন করা হয়েছিল। আর্টেমিস ছিল একজন উর্বরতার দেবী। প্রাচীনত্বের ৭টি বিশ্বের বিস্ময়ের মধ্যে ইফিষের আর্টেমিস মন্দির ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। মন্দিরের আকার ছিল অলিম্পিক ফুটবল মাঠের মত বড় ও সম্পূর্ণভাবে সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরী। তা নির্মানের জন্য ২২০ বছর লেগেছিল। একটি অতিসুন্দর স্তম্ভ দিয়ে সাজানো প্রধান রাস্তা বন্দর থেকে মন্দির এলাকার দিকে যেত।
- আর্টেমিস পূজার সাথে যুক্ত ছিল একটি শক্তিশালী রূপা মিস্ত্রী বাণিজ্য সংস্থা, যারা মন্দিরের ক্ষুদ্র চিত্র বানিয়ে বিক্রি করত (প্রেরিত ১৯:২৪-২৭)। যেহেতু বন্দর ধ্বংসের পথে ছিল, তাই পর্যটন থেকে সেই আয় আরো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- তাছাড়া ইফিষ শহর ছিল যাদু-মন্ত্রের একটি কেন্দ্র। যাদু-মন্ত্রের উপরে সুসমাচারের শক্তিশালী প্রভাবের বর্ণনা প্রেরিত ১৯:১৩-১৯ পদে দেখা যায়: অনেকে বিশ্বাসী হওয়ার পরে তাদের যাদু-মন্ত্রের বইগুলি পুড়ায় যার মূল্য ছিল ৫০ হাজার দিন মজুরী।
- ইফিষ শহরে সম্রাট পূজাও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হত। কৈসর ক্লৌদিয় (৪১-৫৪ খ্রীঃ), পরে কৈসর হাদ্রিয়ান ও কৈসর সেভেরাস ইফিষ শহরে নিজের উদ্দেশ্যে মন্দির নির্মান করেন।
- ইফিষ শহরে একটি বিশাল থিয়েটার ছিল, যেখানে ২৫ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বসতে পারত। এই থিয়েটারে পৌলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘটনায় উল্লিখিত (প্রেরিত ১৯:৩৩-৩৪)।
- সব মিলিয়ে বলা যায় যে, ইফিষ ছিল আত্মিকভাবে অন্ধকারের শক্তিশালী কেন্দ্র।
ইফিষ মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- ৩০ খ্রীঃ প্রেরিত ২:৯ পদ দেখায় যে যিরুশালেমে পঞ্চসপ্তমীর দিনে এশিয়া থেকে যিহূদী পিতরের প্রচার শুনে। তাই হতে পারে যে কেউ কেউ বিশ্বাসী হয়ে ইফিষে ফিরে গিয়ে সেখানে প্রথম মণ্ডলী স্থাপন করে।
- ৫০ খ্রীঃ পৌলের ২য় প্রচার যাত্রায় তিনি এশিয়ায় যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু পবিত্র আত্মা বরং তাকে ম্যাসেডোনিয়ার দিকে যেতে বললেন (প্রেরিত ১৬:৬-১০)।
- ৫২ খ্রীঃ প্রেরিত ১৮:১-২১ পৌলের ২য় প্রচার যাত্রার শেষে তিনি অল্পক্ষণ ইফিষে কাটান এবং সেখানে আকিলা ও প্রিস্কিল্লা নামে এক স্বামী-স্ত্রীকে মণ্ডলী গঠনের জন্য রেখে যান। ঠিক এর আগে পৌল এই স্বামী-স্ত্রীর সাথে করিন্থে দের বছর কাজ করেছিলেন। তার আগে তারা রোম থেকে করিন্থে এসেছিল যখন সম্রাট ক্লৌদিয় সমস্ত যিহূদীদের ইটালী থেকে চলে যেতে আদেশ দিয়েছিলেন।
- ৫৩ খ্রীঃ প্রেরিত ১৯:১-৬ … পৌলের ৩য় প্রচার যাত্রায় পৌল ইফিষে আসেন এবং তার এমন বিশ্বাসীদের সাথে দেখা হয় যারা আত্মা সম্বন্ধে জানে না। তিনি তাদের যীশুর নামে বাপ্তিস্ম দেন ও তাদের জন্য প্রার্থনা করেন।
- ৫৩-৫৬ খ্রীঃ প্রেরিত ১৯:৮-১০ … তয় প্রচার যাত্রায় পৌল ৩ মাস ইফিষে একটি যিহূদী সমাজ গৃহে এবং ২ বছর তুরান্নের স্কুলে প্রচার করেন, শিক্ষা দেন এবং শিষ্য ও কর্মী গঠন করেন। এই সময় ইফিষ সুসমাচার প্রচারের কেন্দ্র হয়ে যায়, যার ফলে ‘সারা এশিয়া’ প্রভুর বাক্য শুনে।
- এই সময় প্রকাশিত বাক্যে উল্লিখিত ‘এশিয়ার ৭টি মণ্ডলী’ পৌল দ্বারা ও তার পাঠানো প্রচারক দ্বারা স্থাপিত হয়। কলসী ও হিয়রাপলি মণ্ডলীও এই সময় স্থাপিত (কল ১:৬-৭, কল ২:১, প্রেরিত ১৯:১০)।
- প্রেরিত ১৯:১১ … ইফিষে পৌল যিহূদীদের হাত থেকে অনেক কষ্ট পান। ৩ মাস সমাজ গৃহে শিক্ষা দেওয়ার পরে তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে বের করে দেয় ও তাকে অত্যাচার করতে থাকে। ২ তীমথিয় ৪:১৪ পদে পৌল তীমথিয়কে একজন যিহুদী ‘তামার মিস্ত্রী আলেকসান্ডার’-এর বিষয়ে সাবধান করেন।
- ইফিষ শহরে পৌল দ্বারা অনেক বড় আশ্চর্য কাজ হয়, এমন কি পৌলের কাপড় দিয়েও সুস্থতা দান ও মন্দ আত্মা তাড়ানো হয় (প্রেরিত ১৯:১১-১২) ।
- নতুন বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেকে তাদের যাদু-মন্ত্রের বই পুড়ায় যার দাম ছিল ৫০ হাজার দিনমজুরী।
- প্রেরিত ১৯:২১-৪১ … সুসমাচার এমন ছড়িয়ে পড়ল, এত মানুষ বিশ্বাসী হল ও পূজা বাদ দিল যে আর্টেমিসের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতির ব্যবসা কমে গেল ও রূপা মিস্ত্রীদের ব্যবস্যায় ক্ষতি হল (প্রেরিত ১৯:২৪)। দীমীত্রিয় নামে একজন রূপার মিস্ত্রী বাণিজ্য ইউনিয়নের সভা ডাকে, যেন সারা শহর অস্থির হয় ও আন্দোলন শুরু করে। বড় থিয়েটারে সভা প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যিহূদীরা আলেকজান্ডারকে দায়ীত্ব দেয় যেন সরকার তাদের খ্রীষ্টান আন্দোলনকারী মনে না করে তা নিশ্চিত করার জন্য। ইফিষের সরকারী কর্মচারীরা শেষে তাদের শান্ত করেন ও তাদের আদালতে মামলা করতে বলেন। তিনি তাদের শাসনকর্তাদের (বহুবচন!) কাছে যেতে বলেন। ইফিষের ইতিহাসে মাত্র একসময় একজন শাসনকর্তার পরিবর্তে দুইজন শাসনকর্তা ছিলেন: ৫৪ খ্রীঃ। এভাবে এই ঘটনার সাল জানা যায়।
- পৌল ইফিষে থাকার সময় সম্বন্ধে রূপকভাবে এই বর্ণনা দেন: ‘বুনো জানোয়ারদের সঙ্গে লড়াই’ (১ করি ১৫:৩২) এবং ‘যে কষ্টে পড়েছিলাম … সহ্যের অতিরিক্ত এমন চাপ আমাদের উপর পড়েছিল যে, বাঁচবার আশা আমরা ছেড়িই দিয়েছিলাম’।
- ৫৬ খ্রীঃ প্রেরিত ২০:১৯-২১, ২৬-৩০ ৩য় প্রচার যাত্রার শেষে পৌল মিলীতে ইফিষের প্রাচীনদের বিদায় বক্তৃতায়
তাদের সাবধান করেন যে ভ্রান্ত শিক্ষকদের দ্বারা মণ্ডলীতে অনেক ক্ষতি আসবে। - ৬২ খ্রীঃ পৌল ‘ইফিষীয়’ নামে একটি চিঠি লিখেন ইফিষ মণ্ডলীর কাছে ।
- ৬৪-৬৫ খ্রীঃ (?) ১ তীমথিয় ১:৩ … পৌল তীমথিয়কে ইফিষের মণ্ডলীর দায়ীত্ব দেন ও তার সাহায্যের জন্য ‘১ তীমথিয়’ চিঠি লিখেন। এই চিঠিতে ভ্রান্ত শিক্ষা সম্বন্ধে অনেক নির্দেশ পাওয়া যায়, এইভাবে পৌলের সাবধানবাণী পূর্ণ হয়ে যায়।
- পিতর তার লেখা ‘১ম পিতর’ চিঠি এশিয়া মাইনরের নানা এলাকায় পাঠান। এর মধ্যে ইফিষও পড়ে। পরে তিনি ‘২য় পিতর’ চিঠিটি লিখেন।
- ৭০ খ্রীঃ যিরুশালেমের ধ্বংসের পর প্রেরিত যোহন ইফিষে বাস করতে থাকেন। সে সময় তিনি ইফিষ মণ্ডলীর প্রাচীন এবং এশিয়া মাইনরের মণ্ডলীর দেখাশুনাকারী হিসাবে কাজ করেন। তিনি ইফিষকে তার কেন্দ্র করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানে থাকেন।
- ৮৫-৯৬ খ্রীঃ প্রেরিত যোহন তার পুস্তকগুলি এই এলাকার জন্য লিখেন: ‘যোহন লিখিত সুসমাচার’, ‘১ম যোহন’, ‘২য় যোহন’ ও ‘৩য় যোহন’।
- যোহনের লেখা ‘প্রকাশিত বাক্যে’ ইফিষ মণ্ডলী একটি ব্যক্তিগত চিঠি পায় (প্রকাশিত বাক্য ২:১-৭)। এই মণ্ডলী ভাল কাজ করে, ধৈর্য্যের সঙ্গে পরিশ্রম করে ও ভ্রান্ত শিক্ষা প্রতিরোধ করে। কিন্তু মণ্ডলীকে তাদের ‘প্রথম প্রেম’-এ ফিরতে চ্যালেঞ্চ করা হয়।
১০ ব্যাখ্যা প্রশ্ন স্মূর্ণা (Smyrna) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ২:৮-১১ পদ স্মূর্ণা মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে স্মূর্ণা শহর সম্বন্ধে এবং স্মূর্ণার মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কি সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
স্মূর্ণার ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- প্রাচীন যুগে স্মূর্ণা (আধুনিক নাম Izmir) ছিল তার সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত একটি শহর। এই শহরের পিছনের পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত অসংখ্য স্তম্ভ দিয়ে সাজানো ঢেউখেলান একটি রাস্তা মন্দির এলাকায় যেত। এটি দেখতে অনেকটা মুকুটের মত। এই বিষয়ের মিল রেখে যীশু প্রকাশিত বাক্য ২:১০ পদে তাদের ‘জীবন মুকুট’ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।
- ইফিষের মত স্মূর্ণাও ছিল একটি প্রাকৃতিক নৌবন্দর। স্মূর্ণা ছিল হের্মেস নদীর মুখে ও সাগরের পাড়ে অবস্থিত। একটি রোমীয় মহাসড়ক স্মূর্ণা বন্দর থেকে পূর্বদিকে যায়। তাই স্মূর্ণাও ছিল পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে বাণিজ্যের একটি বন্দর ও বেচাকেনার কেন্দ্র।
- এই কারণে স্মূর্ণা হের্মেস উপত্যকার আরো উপরদিকে অবস্থিত বৃহৎ শহর সার্দির প্রতিদ্বন্দিত হয়ে উঠে। সার্দি ছিল লিদিয়ান রাজ্যের রাজধানী।
- ৬০০ খ্রীঃপূঃ লিদিয়ান রাজ্যের রাজা আলয়াটেস (Alyattes) স্মূর্ণাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেন। ৩০০ বছর ধরে এই স্থানে আর কেউ বাস করে নি।
- ৩৩৪ খ্রীঃপূঃ গ্রীস-ম্যাসেডোনিয়ার আলেকজান্ডার এই এলাকা দখল করেন। তার মৃত্যুর পর তার সেনাধক্ষ লুসিমাখাস (Lysimachus) এশিয়া মাইনরের প্রধান হয়ে যান। তিনি স্মূর্ণার অবস্থানের গুরুত্ব ও সুবিধা বুঝেন এবং ২৯০ খ্রীষ্ট পূর্বে শহরটি পুনরায় নির্মান করেন। স্মূর্ণার এই ‘ধ্বংস ও পুনঃস্থাপন’ বা ‘মৃত্যু ও পনুরুত্থান’-এর বিষয়ের সাথে মিল রেখে যীশু প্রকাশিত বাক্য ২:৮ পদে নিজের বর্ণনা হিসাবে বলেন ‘যিনি মরেছিলেন ও জীবিত হয়েছেন’।
- স্মূর্ণা এবং সার্দির মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা আবারও শুরু হয়। স্মূর্ণা শুধুমাত্র কূটনৈতিক রণকৌশল দিয়ে নিজেদর রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তাই স্মূর্ণা সবার আগে রোম রাজ্যের উত্থান বুঝে ও তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও জোট তৈরী করে।
- ১৩৩ খ্রীঃপূঃ যখন এশিয়া মাইনর শেষে রোমের অধীনে আসে, তখন স্মূর্ণা ঐই পুরাতন বন্ধুত্বের কারণে রোমীয়দের থেকে বিশেষাধিকার ও সুবিধা পায়।
স্মূর্ণা শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
রোমের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে স্মূর্ণা খুব তাড়াতাড়ি সম্রাট পূজা গ্রহণ করে। ২৩ খ্রীঃ যখন এশিয়ার বিভিন্ন শহরের মধ্যে একটি প্রতিদ্বন্দিতা চলে যে কোন শহরে সম্রাট তিবিরিয়ের উদ্দেশ্যে বিরাট একটি মন্দির নির্মান করা হবে, তখন স্মূর্ণা শহর সার্দিকে পরাজিত করে এই ‘বিশেষাধিকার’ লাভ করে।
- তাই স্মূর্ণা সম্রাট পূজার একটি কেন্দ্র হয়ে যায়। কিন্তু যারা সম্রাট পূজা অগ্রাহ্য করে (খ্রীষ্টানরা) তাদের জন্য স্মূর্ণা হয়ে যায় অত্যাচারের একটি কেন্দ্র। প্রকাশিত ২:৯-১১ পদে যীশু তাদের অত্যাচার ও বন্ধন নিয়ে কথা বলেন।
- স্মূর্ণায় একটি বড় যিহূদী উপনিবেশ ছিল। যীশু তাদের প্রকাশিত বাক্য ২:৯ পদে ‘শয়তানের দলের লোক’ বলে। কারণ তারা মণ্ডলীকে দৃঢ়ভাবে অত্যাচার করত।
স্মূর্ণা মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে স্মূর্ণা মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে স্মূর্ণা মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
- ১৫৫ খ্রীঃ মণ্ডলীর ইতিহাস থেকে জানা যায় যে স্মূর্ণা মণ্ডলীর একজন বিখ্যাত অধ্যক্ষ ছিল। তার নাম পলিকার্প (Polycarp) ও তিনি ছিলেন ঐসময়ের শেষ শিষ্য যিনি যোহনকে চিনতেন। তিনি স্মূর্ণায় শহীদ হন।
১১ ব্যাখ্যা প্রশ্ন পর্গাম (Pergamum) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ২:১২-১৭ পদ পর্গাম মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে পর্গাম শহর সম্বন্ধে এবং পর্গামের মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কত সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
পর্গাম শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- পর্গাম ছিল কাইকাস (Caicas) নদীর উপত্যকার এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি শহর।
- পর্গাম নামের অর্থ হল ‘উঁচু স্থান’, ‘উত্থিত’, ‘দুর্গ’, আশ্রয়স্থান’।
- ৩৩৪ খ্রীঃপূঃ গ্রীস-ম্যাসেডোনিয়ার আলেকজান্ডার পর্গাম ও চারিদিকের এলাকা দখল করেন। তার মৃত্যুর (৩২৩ খ্রীঃপূঃ) পরে সেনাধ্যক্ষ লুসিমাখাস (Lysimachus) এই এলাকার প্রধান হয়ে যায়।
- ২৮২ খ্রীঃপূঃ ফিলেটারাস (Philetaerus) নামে পর্গাম শহরের একজন লুসিমাখাসের রাজবংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তখন চারিদিকে এলাকাগুলি একটি ছোট স্বনির্ভর রাজ্য হয়ে যায় যার কেন্দ্র ছিল পর্গাম শহর।
- যখন ১৯০ খ্রীঃপূঃ সিরিয়ার সিলূসীয় রাজবংশ এলাকাটি দখল করতে চেষ্টা করে তখন রোম তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠায়। পর্গাম ও স্মূর্ণা রোমীয়দের সমর্থন করে। রোমীয়রা সিলূসীয়দের পরাজিত করে।
- ১৩৩ খ্রীঃপূঃ পর্গামের শেষ রাজা আত্তালাস ৩য় (Attalus III) তার রাজ্যের অধিকার ও দায়ীত্ব রোমীয়দের প্রদান করেন। তাই পর্গাম শহর ছিল স্মূর্ণার মত রোমীয়দের একটি বহুদিনের ভাল বন্ধু।
- সম্রাট পূজার উদ্দেশ্যে এশিয়ার প্রথম মন্দির ছিল পর্গামে। পর্গাম শহর সম্রাট আগস্থের জন্য ২৭ খ্রীঃপূঃ একটি মন্দির নির্মান করে। সম্রাটের মূর্তির সামনে ধুপ জ্বালানো হয়ে যায় নিজের বিশ্বস্ততার প্রমান ও রাজনৈতি সুবিধা পাওয়ার একটি পদ্ধতি। এর পরে অন্য সম্রাটদের উদ্দেশ্যে আরো মন্দির নির্মান করা হয়।
- পর্গাম শহরে ছিল একটি বিশাল লাইব্রেরি। আরো ছিল একটি মেডিকেল কলেজ যা এ্যস্কুলাপ (Aesculap) নামে
একটি সুস্থতাদানকারী দেবের উদ্দেশ্যে তৈরী। এ্যস্কুলাপের চিহ্ন ছিল লাঠিতে পেঁচানো সাপ যা আজ পর্যন্ত মেডিকেল বিজ্ঞানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
পর্গাম শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
- পর্গাম ছিল ৪টি বড় পূজার কেন্দ্র: জিউস (বৃহস্পতি, Zeus), আথেনা (Athena), ডিয়ো-নিসস (Dionysos), এ্যস্কুলাপ (Aesculap)। প্রত্যেক দেবতার জন্য একটি বিরাট মন্দির ছিল।
- এ্যস্কুলাপের মন্দির সারা এশিয়া এলাকা থেকে অসুস্থদের ও পঙ্গুদের আকর্ষিত করত। এ্যস্কুলাপ পূজা ও মন্দিরের পরোহিত বা কবিরাজরা অসুস্থদের কি চিকিৎসা দিবে, তা স্বপ্নের মাধ্যমে জেনে নিত।
- পর্গামে একটি বিরাট জিউস মন্দির ছিল যার মধ্যে জিউসের উদ্দেশ্যে উচু একটি মঞ্চে সিংহাসন ছিল। মঞ্চের গায়ে লেখা ছিল: ‘জিউস পরিত্রাতা’। প্রকাশিত বাক্য ২:১৩ পদে উল্লিখিত ‘শয়তানের সিংহাসন’ হতেও পারে এই জিউস মন্দির বুঝায়।
- পুরানো জিউস পূজা ও আধুনিক সম্রাট পূজা আস্তে আস্তে এক হয়ে যায়। তাই দেবতা পূজার আত্মিক চাপ এবং সম্রাট পূজার রাজনৈতিক চাপ এক হয়ে যায়। একজন বিশ্বাসী যে সম্রাট পূজায় অংশ গ্রহণ করতে প্রত্যাখান করে, তাই তাকে রাষ্ট্রের শত্রু বলে চিহ্নিত করা হয়।
পর্গাম মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে পর্গাম মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে পর্গাম মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
- প্রকাশিত বাক্য ২:১৩ পদে বুঝা যায় যে পর্গামে ইতিমধ্যে একজন বিশ্বাসী শহীদ মৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন: ‘আমার বিশ্বস্ত সাক্ষী আন্তিপাস্ তোমাদের সামনে খুন হয়েছিল’। এটা আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নয় যে এই রকম সম্রাট পূজার কেন্দ্রে মণ্ডলীদের মধ্যে প্রথম শহীদ হয়েছে।
- প্রকাশিত বাক্য ২:১৪-১৫ যীশু পর্গাম মণ্ডলীকে একটি ‘নীকলায়তীয়’ নামে ভ্রান্ত দল নিয়ে সাবধানবাণী দেন। তাদের শিক্ষা ঠিক কি ছিল আর জানা যায় না, কিন্তু মনে করা হয় যে তারা সম্রাট পূজার সাথে অথবা বাণিজ্য ইউনিয়নের দেবতাপূজাকারী অনুষ্ঠানের সাথে আপস করতে মণ্ডলীকে শেখাত। হতেও পারে এর জন্য যীশু তাদের ব্যভিচার ও প্রতিমার কাছে উৎসর্গ করা খাবার নিয়ে ধমক দেন।
১২ ব্যাখ্যা প্রশ্ন থুয়াতিরা (Thyatira) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ২:১৪-২৭ পদ থুয়তিরা মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে থুয়াতীরা শহর সম্বন্ধে এবং থুয়াতীরার মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কত সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
থুয়াতীরা শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- থুয়াতীরা ছিল রোমীয় সড়কের চৌরাস্তায় অবস্থিত একটি শহর, পর্গাম থেকে লায়দিকেয়ার পথে।
- ৩৩৪ খ্রীঃপূঃ গ্রীস-ম্যাসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার এই এলাকা দখল করেন। ৩২৩ খ্রীঃপূঃ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সেনাধ্যক্ষ লুসিমাখাস (Lysimachus) এই এলাকার প্রধান হয়ে যান। থুয়াতীরা তার রাজ্যের উত্তর সীমানার কাছে বলে তিনি শহরকে সীমানা সুরক্ষাকারী শক্তিশালী দুর্গ ও সেনানিবাস হিসাবে ব্যবহার করেন।
- ২৮২ খ্রীঃপূঃ যখন পর্গামের ফিলেটারাস (Philetaerus) সিলূসীয়দের থেকে স্বনির্ভর হয়ে যায়, থুয়াতীরা এই নতুন পর্গাম রাজ্যের উত্তরের সীমানার দুর্গ শহর হিসাবে থাকে।
- ১৩৩ খ্রীঃপূঃ যখন পর্গামের শেষ রাজা আত্তালাস ৩য় (Attalus III) রোমীয়দের তার রাজ্যের দায়ীত্ব ও অধিকার প্রদান করেন, থুয়াতীরা রোমের অধিনে চলে আসে। যেহেতু রোমীয়রা সারা এলাকা দখল করে, তাই থুয়াতীরা আর সীমানার শহর হিসাবে ছিল না।
- থুয়াতীরা শহর ছিল সামরিক অস্ত্র-সস্ত্রের বাণিজ্য কেন্দ্র। থুয়াতীরা বিশেষভাবে তাদের ব্রোঞ্জের বর্মের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই বিষয়ের সঙ্গে মিল রেখে যীশু প্রকাশিত বাক্য ২:১৮ পদে নিজেকে এভাবে বর্ণনা করেন: ‘ঈশ্বরের পুত্র যাঁর চোখ আগুনের শিখার মত এবং পা খুব চক্চকে পিতলের মত’।
- থুয়াতীরায় শক্তিশালী বাণিজ্য ইউনিয়ন ছিল, এর মধ্যে একটি ছিল ধাতুর মিস্ত্রীর ইউনিয়ন। প্রত্যেক বাণিজ্য ইউনিয়নে নির্দিষ্ট পেশার সুরক্ষাকারী দেবতার পূজা করা হত। কাজের চুক্তি মন্দিরে করা হত ও অনুষ্ঠানের অংশ ছিল দেবতাপূজা, উৎসর্গ, উৎসর্গ করা খাবার খাওয়া ও অনৈতিক কাজ। সাধারণ মিস্ত্রী যদি ইউনিয়নের সভা ও অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ না করত, তার কাজে অনেক ক্ষতি হত। তাই বিশ্বাসী হলে গেলে অনেক অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হত।
- ধাতুর কাজের পাশাপাশি থুয়াতীরায় বিভিন্ন জিনিষের উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয় হত, যেমন – কুমার কাজ, লাল ও বেগুনী রং, লাল ও বেগুনী কাপড় তৈরী, ইত্যাদি। থুয়াতীরায় তারা বেগুনী রঙ্গের জন্য দামী সামুক পরিবর্তে একটি এর চেয়ে সস্তা গাছের মূল ব্যবহার করত। প্রেরিত ১৬:১৪ থুয়াতীরার মহিলা-ব্যবসায়ী লুদিয়া ফিলিপী শহরে সুসমাচার শুনে সাড়া দেন।
- থুয়াতীরায় একটি ছোট যিহূদী দলও ছিল।
থুয়াতীরা শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
- থুয়াতীরার স্থানীয় দেবতা ছিল একজন যোদ্ধা দেব, যার মূর্তি দেখা দিত একজন যোদ্ধার মত, যে হাতে কুঠার নিয়ে ঘোড়ার উপর বসে আছে। এই বিষয়ে মিল রেখে প্রকাশিত বাক্যে ১৯:১১ পদ থেকে যীশুর বর্ণনা পাওয়া যায় একজন যোদ্ধা, সাদা ঘোড়ায় বসা যিনি যুদ্ধে নামেন। প্রকাশিত বাক্য ২:২৬-২৭ পদে থুয়াতীর মণ্ডলীর জন্য যীশুর প্রতিজ্ঞাও সামরিক রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়, যেমন – ‘কর্ত্তৃত্ব দেব’, ‘লোহার দণ্ড দিয়ে শাসন করবে’, ‘চুরমার করে ফেলা’, ‘জয়ী হওয়া’।
- যীশু এই মণ্ডলীকে ধমক দেন যে তারা ‘ঈষেবলের শিক্ষা’ মেনে নিয়েছে। পুরাতন নিয়মের ঈষেবল ছিল ইস্রায়েলের রাজা আহাবের শক্তিশালী, যৌন আকৃষ্টকারী ও সম্মোহিনী স্ত্রী, যিনি সারা ইস্রায়েলকে দেবতাপূজায় ফেলে (রাজাবলি, বংশাবলি দেখুন)। হতেও পারে থুয়াতীরায় একটি কূটিল ও প্রতারনাকারী মহিলা মণ্ডলীর উপরে খারাপ প্রভাব ফেলে। প্রকাশিত বাক্য ২:২০ পদে এই মহিলার বিষয়ে ব্যভিচার ও প্রতিমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা খাবার উল্লিখিত বলে, মনে হয় যে এই মহিলা মণ্ডলীকে ইউনিয়নের অনুষ্ঠানের সঙ্গে আপস করতে শিখিয়েছেন। হয়তো এই মহিলা ছিল এই ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নতুন বিশ্বাসী যাকে যথেষ্ট শিষ্য করা হয় নি। অথবা সে ছিল মণ্ডলীর বাইরের এমন একজন যে শক্তিশালীভাবে মণ্ডলীকে প্রতারণায় ফেলেছিল।
- থুয়াতীরায় আপল্লো দেবের উদ্দেশ্যে একটি মন্দির ছিল। আস্তে আস্তে আপল্লো পূজা ও নতুন সম্রাট পূজা এক হয়ে যায় যেহেতু তখন শেখানো হত যে বর্তমান রোমীয় সম্রাট হল আপল্লোর অবতার। তাই থুয়াতীরায়ও পর্গামের মত আত্মিক চাপ ও রাজনৈতিক চাপ এক হয়ে যায়।
- থুয়াতীরায় অনেক গুপ্ত ভ্রান্ত দল ছিল, বিশেষভাবে সিবেলে (Cybele) দেবীর দল। তার পূজা ছিল অনৈতিক ও মত্ততার পূজা।
থুয়াতীরা মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে থুয়াতীরা মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে থুয়াতীরা মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
- হয়তো থুয়াতীরা মণ্ডলী লুদিয়া দ্বারা স্থাপিত যিনি ফিলিপী শহরে পৌলের প্রচারে বিশ্বাসী হয়েছিলেন (প্রেরিত ১৬:১৪) ও হয়তো তার শহরে ফিরে সেখানে মণ্ডলী স্থাপন করেন। ৫০ খ্রীষ্টাব্দে লুদিয়া বিশ্বাসী হয়েছিলেন।
১২ ব্যাখ্যা প্রশ্ন সার্দি (Sardis) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ৩:১-৬ পদ সার্দি মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে সার্দি শহর সম্বন্ধে এবং সার্দির মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কত সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
সার্দি শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- সার্দি ছিল টিমলাস্ নামে একটি পাড়ারের খাড়া জায়গায় অবস্থিত শহর। এই শহরটি একটি আশ্রয়স্থান বা দুর্গের মত ছিল, তিনদিকে দেওয়াল এমন খাড়া জায়গার উপর নির্মিত ছিল যে কেউ আক্রমন করতে পারত না। শহরের কাছাকাছি পাত্রক্লস্ নামে একটি বিখ্যাত নদী ছিল কারণ সেখানে সোনা পাওয়া যেত।
- সার্দি শহর ছিল রোমীয় মহাসড়কের একটি চৌরাস্তায়। তাই সার্দি ছিল একটি বেচাকেনার কেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রন কেন্দ্র।
- এশিয়া এলাকার মধ্যে সার্দি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পুরাতন শহর। সার্দি ছিল লিদিয়ান রাজ্যের রাজধানী।
- সার্দি বলতেই মানুষ বুঝত ‘ধনী’। রূপা ও সোনা পাওয়া যেত বলে সার্দি ছিল নিজস্ব মুদ্রা প্রস্তুতকারী প্রথম শহর।
- সার্দির সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা ছিলেন ক্রসাস (Croesus)। আজ পর্যন্ত ইংরেজী ভাষায় একজনকে ‘ক্রসাস’ বলা যদি সে অতিরিক্ত ধনী হয়। কিন্তু ক্রসাসের রাজত্ব হঠাৎ করে ৫৪৯ খ্রীষ্ট পূর্বে শেষ হয় যখন পারস্যরা আশ্চর্যভাবে সার্দিকে আক্রমন ও দখল করে।
- আশ্চর্যভাবে দখলের ঘটনা: পারস্যদের একজন সেনা সার্দির খাড়া জায়গা আরোহণ করে আক্রমণ করে যদিও সার্দির সেনারা মনে করে ছিল এই পথে কেউ আক্রমণ করবে না। এভাবে শহরটি পারস্যদের হাতে চলে যায়।
- ৩৩৪ খ্রীঃপূঃ গ্রীস-ম্যাসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার এই এলাকা দখল করেন। ৩২৩ খ্রীঃপূঃ আলেকজান্ডারের মৃত্যু পর তার সেনাধ্যক্ষ সিলূসীয় (Seleucius) এই এলাকার প্রধান হয়ে যান।
- ২৮২ খ্রীঃপূঃ ফিলেটারাস (Philetaerus) নামে পর্গামের একজন যখন সিলূসীয় রাজবংশ থেকে স্বনির্ভর হয়ে পর্গামের একটি রাজ্য তৈরী করতে সক্ষম হন তখন সার্দি শহরও তার অধীনে চলে আসে।
- ২১৪ খ্রীঃপূঃ সিলূসীয় রাজবংশ সার্দিকে পুনরায় দখল করতে চেষ্টা করে। ঠিক ৫৪৯ খ্রীষ্ট পূর্বের আশ্চর্য আক্রমনের মত সার্দিকে আবারও এভাবে দখল করা হয়।
- যখন পর্গামের শেষ রাজা আত্তালাস ৩য় (Attalus III) তার রাজ্যের অধিকার ও দায়ীত্ব রোমীয়দের প্রদান করেন, তখনও সার্দি পর্গাম রাজ্যের অধীনে থাকে যায়। ফলে তাদের সাথে সার্দিও রোমীয়দের অধীনে চলে আসে।
- ১৭ খ্রীষ্টাব্দে সার্দি শহর একটি বিরাট ভূমিকম্প দ্বারা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও সম্রাট তিবিরিয় সার্দির পুনরায় নির্মানের জন্য অনেক টাকা পাঠান, তবুও শহরটি আগের মত গুরুত্বপূর্ণ আর হয় না।
সার্দি শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
- প্রকাশিত বাক্য ৩:৪ যীশু তাদের উল্লেখ করেন ‘যারা তাদের কাপড়-চোপড় নোংরা করেন নি’। হতেও পারে তা এমন বিশ্বাসীদের বুঝায় যারা এই ধরনের পূজার সাথে আপস করে নি। প্রকাশিত বাক্য ৩:৫ পদে যীশু তাদের প্রতিজ্ঞা দেন যে তারা সাদা পোশাক পরে তার সঙ্গে চলাফেরা করবে … যীশু তাদের নাম কখনও জীবন বই থেকে মুছে ফেলবেন না।
- ২৩ খ্রীঃ যখন এশিয়ার বিভিন্ন শহরের মধ্যে একটি প্রতিদ্বন্দিতা চলে যে কোন শহরে সম্রাট তিবিরিয়ের উদ্দেশ্যে বিরাট একটি মন্দির নির্মান করা হবে, তখন স্মূর্ণা শহর সার্দিকে পরাজিত করে এই ‘বিশেষাধিকার’ লাভ করে।
- সার্দি শহর ছিল তার ধন, তার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার অহংকার, দম্ভ ও অনুমানের জন্যও। তারা আরো বিখ্যাত ছিল তাদের মিথ্যা নিরাপত্তা এবং আশ্চর্য ও লজ্জাকর পরাজয়ের জন্য। প্রকাশিত বাক্য ৩:১ পদে যীশু তা নিয়ে তাদের ধমক দেন ‘জীবিত বলে তোমার বেশ সুনাম আছে, তিন্তু আসলে তমি মৃত’। প্রকাশিত বাক্য ৩:৩ পদে যীশু সাবধানবাণী দেন যে তিনি চোরের মত (আশ্চর্য আক্রমনের মত) আসবেন তাদের বিচার করতে।
সার্দি মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে সার্দি মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে সার্দি মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
১৩ ব্যাখ্যা প্রশ্ন ফিলাদিলফিয়া (Philadelphia) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ৩:৭-১৩ পদ ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে ফিলাদিলফিয়া শহর সম্বন্ধে এবং ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কত সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
ফিলাদিলফিয়া শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- ফিলাদিলফিয়া নামের অর্থ হল ‘ভ্রাতৃপ্রেম’। ফিলাদিলফিয়া শহর পর্গাম রাজা আত্তালাস ২য় (Attalus II, ১৫৯-১৩৮ খ্রীঃপূঃ) দ্বারা স্থাপিত হয় যিনি তার প্রিয় ভাই এউমেনেসের জন্য শহরের নাম ফিলাদিলফিয়া রাখেন।
- ফিলাদিলফিয়া ছিল হের্মেস (Hermes) নদীর উপত্যাকায় এবং তা সেই রোমীয় মহাসড়কে অবস্থিত ছিল যা স্মূর্ণা থেকে সার্দিসের দিকে গিয়েছে। ফিলাদিলফিয়া ছিল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
- ফিলাদিলফিয়ার চারিদিকের এলাকা ছিল উর্বর। তাদের প্রধান ফসল আঙ্গুর বলে ফিলাদিলফিয়া ছিল মদ উৎপাদনের জায়গা।
- শহরটিকে ‘ছোট এথেন্স’ও বলা হত কারণ তার মন্দির ও তার দালানের স্থাপত্য ছিল চমৎকার।
- শহরের বেশ কাছে ছিল বড় একটি আগ্নেয়গিরি এলাকা ও অনেক পোড়া জমি। সাথে ফিলাদিলফিয়ায় অনেক ভূমিকম্প হত এবং কয়েকবার শহরের অনেক ক্ষতি হয়, বিশেষভাবে ১৭ খ্রীষ্টাব্দের বড় ভূমিকম্প দ্বারা।
- প্রকাশিত বাক্য ৩:১২ পদে যীশু একটি স্থিরতার ও নিরাপত্তার প্রতিজ্ঞা দেন ‘যে জয়ী হবে আমি তাকে আমার ঈশ্বরের ঘরের একটা থাম করব, সে আর কখনও বাইরে যাবে না’। ফিলাদিলফিয়ার বাসিন্দারা যারা ভূমিকম্পে দালান টুকরা হতে দেখতে দেখতে পালিয়েও গিয়েছিল, তারা এই রূপকের অর্থ ও প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব ভালভাবে বুঝত।
- ১৭ সালের ভূমিকম্পের পরে সম্রাট তিবিরিয় শহরের পুনরায় নির্মানের জন্য অনেক টাকা পাঠান। ফিলাদিলফিয়া কৃতজ্ঞতা স্বরূপ শহরের নাম ‘নিও-কৈসরিয়া’ রাখার পরিকল্পনা নেয়। সম্রাট ফ্লাভিয়ানের সময় শহরের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘ফ্লাভিয়া’ হয়।
- এই নাম পরিবর্তনের বিষয়ের সাথে মিল রেখে যীশু প্রকাশিত বাক্য ৩:১২ পদে ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীকে এই প্রতিজ্ঞা দেন ‘আমি তার উপরে আমার ঈশ্বরের নাম এবং আমরা ঈশ্বরের শহরের নাম লিখব’।
ফিলাদিলফিয়া শহরের আত্মিক পরিস্থিতি
- যেহেতু আঙ্গুর ও মদ ছিল ফিলাদিলফিয়ার প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য, তাই তার প্রধান দেব ছিল ডিয়োনিসস্ (গ্রীক) বা বাখুস (ল্যাটিন), যিনি ছিলেন মদ ও মত্ততার দেব। তার পূজার অংশ ছিল নিয়ন্ত্রনহীন মত্ততা, লম্পট্যতা ও ব্যভিচার।
- ফিলাদিলফিয়াতে একটি সক্রিয় ও অত্যাচারী যিহূদী দল ছিল যার উল্লেখ রোমীয় ইতিহাসেও পাওয়া যায়। প্রকাশিত বাক্য ৩:৯ পদে যীশু অত্যাচারের বর্ণনা দেন ও অত্যাচারিত মণ্ডলীকে প্রতিজ্ঞা করেন: ‘যারা নিজেদের যিহূদী বলে অথচ যিহূদী নয়, শয়তানের দলের সেই মিথ্যাবাদী লোকদের আমি তোমার কাছে আনাব এবং তোমার পায়ে প্রণাম করাব, আর তাদের জানিয়ে দেব যে, আমি তোমাকে ভালবাসি’।
- ৬০০ বছর পর যখন মুসলমানরা সারা এশিয়া দখল করে, ফিলাদিলফিয়া ছিল সেই শহর যা শেষ পর্যন্ত স্থির ছিল। প্রকাশিত বাক্য ৩:৮ পদে যীশু প্রতিজ্ঞা করেন যে ‘আমি তোমার সামনে একটি খোলা দরজা রাখলাম যা বন্ধ করবার ক্ষমতা কারও নেই’। আজ পর্যন্ত এই শহরে একটি বিশ্বাসী দল রয়েছে।
ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
১৪ ব্যাখ্যা প্রশ্ন লায়দিকেয়া (Laodicea) – শহরের ও মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস কি কি?
নির্দেশনা
প্রকাশিত বাক্য ৩:১৪-২২ পদ ফিলাদিলফিয়া মণ্ডলীর কাছে যীশুর বাণী পড়ুন। নিচে লায়দিকেয়া শহর সম্বন্ধে এবং লায়দিকেয়ার মণ্ডলী সম্বন্ধে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য করুন, যীশু কত সুন্দর ও নির্দিষ্টভাবে এই মণ্ডরীর কাছে কথা বলেন।
বিবেচনা করুন
লায়দিকেয়া শহরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক তথ্য
- সিলূসীয় রাজা আন্তিয়খিয় ২য় (Antiochius II), যিনি ২৬১ থেকে ২৪৬ খ্রীষ্ট পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন, তিনি লায়দিকেয়া শহরের স্থাপনকারী। তার স্ত্রীর নাম ছিল লায়দিকী। তার নামানুসারে এই শহরের নামকরণ করা হয় লায়দিকেয়া।
- এই শহরটি বড় ও পুরান একটি মহাসড়কের চৌরাস্তায় অবস্থিত। পূর্ব থেকে পশ্চিমের প্রায় সমস্ত বেচাকেনা লায়দিকেয়া শহরের মধ্য দিয়েই করতে হত। আগে লায়দিকেয়ার কাছাকাছি শহর “কলসী” ছিল এমন গুরুত্বপূর্ণ শহর । কিন্তু যখন রোমীয়রা রাস্তার দিক একটু পরিবর্তন করে তখন লায়দিকেয়া হঠাৎ করে গুরুত্ব পায় ও তাড়াতাড়ি উন্নত হয়ে যায় (বাংলাদেশ: পাটুরীয়া > মাওয়া)।
- ১৩৩ খ্রীষ্ট পূর্বের পর লায়দিকেয়া রোমীয়দের অধীনে চলে যায়। রোমীয়রা এই শহরকে আরো বেশী সামরিক ও বেচাকেনার কেন্দ্র হিসাবে উন্নত করে। প্যালেষ্টাইন এবং সিরিয়া থেকে রোমীয়রা যত কর ও মাল আদায় করত, সব লায়দিকেয়ার মধ্য দিয়ে যেত। লায়দিকেয়ার বেচাকেনার উপর কর নেয়ার অধিকার ছিল। এভাবে লায়দিকেয়া তাড়াতাড়ি ধনী হয় এবং ব্যাংকিং ও অর্থ বিনিময়ের কেন্দ্র হয়ে উঠে।
লায়দিকেয়ার আত্মিক পরিস্থিতি
- লায়দিকেয়ার প্রধান মন্দির ছিল আপল্লো দেবের। যখন সম্রাট শুরু হয়, আগের আপল্লোর পূজা ও আধুনিক সম্রাট পূজা তাড়াতাড়ি এক হয়ে যায় এই বলে যে বর্তমান রোমীয় সম্রাট আপল্লোর অবতার। তাই আত্মিক চাপ ও নতুন রাজনৈতিক চাপ এক হয়ে খ্রীষ্টানদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্চ হয়।
- লায়দিকেয়ায় গুপ্ত ভ্রান্ত দল ছিল, বিশেষভাবে সিবেলে (Cybele) দেবীর পূজা।
- লায়দিকেয়ার ছিল একটি শক্তিশালী যিহূদী উপনিবেশ যার লোকসংখ্যা ছিল এগার হাজার। রোম সরকার যিহূদীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিতেন।
- ৬০ খীষ্টাব্দে একটি ভূমিকম্পে লায়দিকেয়ার অনেক ক্ষতি হয়। যখন রোমীয় সম্রাট শহরটি পুনরায় নির্মানের জন্য টাকা পাঠাতে চান তখন তারা তা নিতে অগ্রাহ্য করে বরং নিজের টাকা দিয়ে পুনরায় নির্মান করে। তাই লায়দিকেয়াবাসী ছিল বেশ অহংকারী, স্বনির্ভর ও আত্ম-সন্তুষ্ট। প্রকাশিত ৩:১৭-১৮ পদে যীশু এই একই মনোভাব নিয়ে লায়দিকেয়া মণ্ডলীকে ধমক দেন: ‘তুমি বলছ, ‘আমি ধনী; আমি বড় লোক হয়েছি, তাই আমার কোন কিছুর অভাব নেই।’ বেশ ভাল, কিন্তু তুমি তো জান না যে, তুমি দুঃখী, দয়ার পাত্র, গরীব, অন্ধ ও উলঙ্গ।’
- লায়দিকেয়ায় একটি বিখ্যাত মেডিকেল কলেজ ছিল, যার চোখের চিকিৎসার জন্য (চোখের মলম) বিশেষ সুনাম ছিল।
- লায়দিকেয়া এলাকা ছিল উর্বর। তারা একটি বিশেষ ধরণের ভেড়া পুষত, যার সুন্দর চকচকে কালো উল থেকে তারা দামী উলকাপড় বানাত। তারা আরো বিখ্যাত ছিল তাদের বেগুনী রং ও বেগুনী কাপড় রপ্তানীর জন্য।
- প্রকাশিত বাক্য ৩:১৭-১৮ পদে যীশু তাদের একটি অতি ব্যক্তিগত ও নির্দিষ্ট ধমক দেন: “তুমি বলছ, ‘আমি ধনী; আমি বড় লোক হয়েছি, তাই আমার কোন কিছুর অভাব নেই।’ বেশ ভাল, কিন্তু তুমি তো জান না যে, তুমি দুঃখী, দয়ার পাত্র, গরীব, অন্ধ ও উলঙ্গ। তাই আমি তোমাকে এই উপদেশ দিচ্ছি – তুমি আমার কাছ থেকে আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি করা সোনা কিনে নাও যেন তুমি ধনী হতে পার। আমার কাছ থেকে সাদা পোশাক কিনে পর যেন তোমার উলঙ্গতার লজ্জা দেখা না যায়। আমার কাছ থেকে চোখে দেবার মলম কিনে নাও যেন তুমি দেখতে পাও।”
- লায়দিকেয়া শহরে স্থায়ী পানির কোন সরবরাহ ছিল না। চারিদিকের এলাকার ঝড়না থেকে কৃত্রিম জল-প্রণালী দিয়ে শহরের জন্য পানির ব্যবস্থা করা হত। এই এলাকায় প্রাকৃতিক গরম জলের ঝড়নাও ছিল। খাবার পানির জন্য ঠাণ্ডা ঝড়না থেকে এবং অন্যান্য কাজের জন্য গরম ঝড়না থেকে শহরে পানি আনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল যে দূর থেকে আনার কারণে ঠাণ্ডা পানি আর ঠাণ্ডা ছিল না, গরমও আর গরম ছিল না।
লায়দিকেয়া মণ্ডলীর স্থাপন ও ইতিহাস
- নতুন নিয়মে লায়দিকেয়া মণ্ডলীর স্থাপনের বর্ণনা নেই, আর কোন ঐতিহাসিক লেখায়ও তা পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে এই মণ্ডলী স্থাপিত হয় যখন পৌল প্রায় ৩ বছর ইফিষে কাজ করেন ও ‘সারা এশিয়া প্রভুর বাক্য শুনে’ (প্রেরিত ১৯:১০)। তা যদি হয়, তাহলে লায়দিকেয়া মণ্ডলীর স্থাপনের সাল ৫৩-৫৬ খ্রীঃ।
- লায়দিকেয়া মণ্ডলীর স্থাপনকারী হতেও পারে ইপাফ্রা নামে একজন ব্যাক্তি। হতেও পারে তিনি পৌলের ইফিষ শহরের কাজ দ্বারা বিশ্বাসী, শিষ্য ও কর্মী হয়ে যান। তার দেশ কলসী (কলসীয় ৪:১২)। হতেও পারে পৌল তাকে সুসমাচার প্রচারক হিসাবে নিজের দেশে পাঠান। কলসীয় ১:৭ পদে বুঝা যায় যে ইপাফ্রা কলসী মণ্ডলীর স্থাপনকারী। তিনি নিজেকে লায়দিকেয়া ও হিয়রাপলি মণ্ডলীর জন্য দায়ী মনে করেন (কলসীয় ৪:১২)। কলসী, লায়দিকেয়া ও হিয়রাপলি এই শহরগুলি একই উপত্যকায় অবস্থিত বলে মনে করা হয় যে ইপাফ্রা লায়দিকেয়া মণ্ডলীরও স্থাপনকারী।
- পৌল কলসীয় ৪:১৬ পদে উল্লেখ করেন যে তিনি লায়দিকেয়া মণ্ডলীর জন্যও চিঠি লিখেছেন। হতেও পারে এই চিঠি আর নেই। কেউ কেউ মনে করে যে ‘ইফিষীয়’ হচ্ছে সেই চিঠি।
আমরা প্রকাশিত বাক্যের ৭টি মণ্ডলীর ঐতিহাসিক পরিস্থিত নিয়ে অনেক কিছু শিখেছি। এখান আমরা প্রকাশিত বাক্যের ব্যাখ্যা নিয়ে শুরু করব।
