ইস্রায়েলের প্রথম রাজা শৌলের আহ্বান ও অভিষেক ১০৫১-১০১১ খ্রীঃপূঃ
  • ঈশ্বর ইস্রায়েলের জন্য একটি নির্বাচিত ও প্রতিনিধিমূলক সরকারের পদ্ধতি স্থাপন করেছিলেন (দ্বিতীয় বিবরণ ১:১৩), অর্থাৎ প্রত্যেক প্রজন্ম নতুন করে যোগ্য নেতাদের নিযুক্ত করার সুযোগ পায়। কিন্তু ভাববাদী শমূয়েলের সময়ে ইস্রায়েল একজন রাজাকে, অর্থাৎ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি করে। রাজতন্ত্র মানে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন এক পরিবারের হাতে থাকবে। তাই প্রশ্নটি ওঠে: কোন পরিবারটিকে রাজত্ব কারার অধিকার দেব?
  • যদিও লোকেরা এখানে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবুও ঈশ্বরতাদেরকে আশীর্বাদ করতে চাচ্ছেন। তিনি তাই বর্তমানে সবচেয়ে ভাল নেতাকে খোঁজ করেন।
  • ঈশ্বর বিন্যামিন বংশের কীশের ছেলে যুবক শৌলকে ইঙ্গিত করেন (১ শমূয়েল ৯:১, ১ বংশা ৮:২৯)। শৌলের পরিবার হল বিন্যামিন গোষ্ঠির এলাকার গিবেয়া শহরের বেশ ধনী একটি পরিবার। যত ভাল পেতে পারেন, ঈশ্বর তত ভালটা পছন্দ করেন।
  • শৌলকে এভাবে বর্ণনা করা হয়: “তিনি ছিলেন বয়সে যুুবক এবং দেখতে সুন্দর। ইস্রায়েলীয়দের মধ্যে তাঁর মত সুন্দর আর কেউ ছিল না। তিনি অন্য সকলের চেয়ে প্রায় এক ফুট লম্বা ছিলেন” (১ শমূয়েল ৯:২)।
  • যখন কীশের গাধাগুলো হারিয়ে যায় তখন তিনি শৌল এবং সাথে একজন সাহায্যকারীকে গাধাগুলো খুঁজতে পাঠান (১ শমূয়েল ৯:৩-৪)। তারা এই গাধাগুলোর খোঁজে বেশ দূরে গিয়ে বিন্যামিন এবং ইফ্রায়ীমের এলাকা পার হয়ে সূফ শহর পর্যন্ত পৌছায়।
  • তিন দিন ধরে যাত্রা করার পরে শৌল গাধা না পেলেও নিজের বাসায় ফেরার পরিকল্পনা করে, এই যথার্থ কথা বলে যে, সম্ভবত তার বাবা এখন গাধার চেয়ে তাদেরই অনুপস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তিত (১ শমূয়েল ৯:৫)। সাহায্যকারী জানে যে, ভাববাদী শমূয়েল শহরে আসবে, তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা ফেরার আগে শমূয়েলের কাছ থেকে একটি বাণী বা খোঁজ পেতে চেষ্টা করবে (১ শমূয়েল ৯:৬)।
  • ঈশ্বর ভাববাদী শমূয়েলকে আগের দিনে বলেছিলেন যে, পরের দিনেই ভবিষ্যৎ রাজার সাথে তার দেখা হবে যেন তিনি তাকে ইস্রায়েলের শাসনকর্তা হিসাবে অভিষিক্ত করেন। ঈশ্বর তার সম্বন্ধে প্রতিজ্ঞা দেন যে, “পলেষ্টীয়দের হাত থেকে সে-ই আমার লোকদের উদ্ধার করবে। আমার লোকদের দিকে আমি মনোযোগ দিয়েছি, কারণ তাদের কান্না আমার কানে এসে পৌঁছেছে” (১ শমূয়েল ৯:১৬)। ঈশ্বরের এই কথাটি অবশ্যই মোশি এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বিচারকদের আহ্বানের সময়ে ঈশ্বরের বাণীর সাথে বেশ মিল আছে।
  • শমূয়েল শৌলকে এই বলে নিমন্ত্রণ করেন “ইস্রায়েলের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা কি তোমার ও তোমার আর তোমার বাবার বংশের উপরে নয়?”
  • এই কথা শুনে শৌল উত্তরে বলেন “আপনি কেন আমাকে এই সব কথা বলছেন? ইস্রায়েলীয়দের সমস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে বিন্যামীনই হল সবচেয়ে ছোট, আর আমি সেই গোষ্ঠীর লোক। আবার বিন্যামীন-গোষ্ঠীতে যতগুলো বংশ আছে তার মধ্যে আমাদের বংশটা একেবারেই ধরবার মধ্যে নয়?” (১ শমূয়েল ৯:২০-২১)।
  • শৌল কি এখানে অতি ভদ্র? বা তা কি হীনম্যতা প্রকাশ করার মত কথা? গিদিয়োন তার আহ্বানে একই কথা বলেছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শৌলের বাবা কীশ বেষ ধনী।
  • ১ শমূয়েল ৯:১৭-২৭ পদে বর্ণনা করা হয়, শমূয়েলের সেই উৎসর্গ অনুষ্ঠানে শৌলকে কিভাবে সম্মানিত করা হয়। শৌলের জন্য তা অবশ্যই ছিল মাথা ঘুরার মত, কিছুটা ভয়ের, কিছুটা উত্তেজিত হওয়া বিষয়।
  • পরবর্তী দিন ভোর সকাল বেলায় যখন সাক্ষী বলতে কেউ ছিল না, তখন শমূয়েল শৌলকে চুম্বন করে অভিষিক্ত করেন এই বলে “সদাপ্রভু তাঁর লোকদের উপরে তোমাকে নেতা হিসাবে অভিষেক করলেন”। এইভাবে শৌলকে আহ্বান, ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা ও তার কাজের বর্ণনা দেওয়া হয়। সাথে তিনি শমূয়েলের সম্মান, বন্ধুত্ব ও ভালবাসা পান (১ শমূয়েল ১০:১)।
  • এছাড়া শমূয়েল শৌলকে কিছু অতি নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী ও নির্দেশনা দেন, তিনি সেই দিনে কি অভিজ্ঞতা লাভ করবেন এবং তার কি করা দরকার, সাথে ৩টি চিহ্নও পান (১ শমূয়েল ১০:১-৮)। সব দিকে ঈশ্বর তার জন্য ব্যবস্থা নেবেন: গাধারা খুঁজে পাওয়া গেছে, পথে লোকেরা তাকে খাবার যোগান দেবে, তিনি একটি আত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করবেন, অর্থাৎ পবিত্র আত্মা তার উপরে আসবে এবং তিনি “অন্য ধরণের মানুষ” হয়ে যাবেন।
  • সেই দিনে শমূয়েলের প্রত্যেকটি কথা পূর্ণ হয় (১ শমূয়েল ১০:৯-১৩)। এভাবে ঈশ্বর তাকে শক্তিশালীভাবে ও অলৌকিকভাবে নিশ্চয়তা দেন যে, তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করবেন। তিনি শৌলকে বিশ্বাস তৈরিকারী ঘটনা, এমন কি ঈশ্বরের সঙ্গে একটি আত্মিক অভিজ্ঞতা দান করেন।
  • “শৌলও কি নবীদের মধ্যে একজন?”, এই কথাটি প্রবাদের মত হয়ে যায়, শেষে কিছুটি হাস্যকর বা টিটকারী কথাও হয়ে দাঁড়ায় – হতে পারে শৌল ’ধর্মে ব্যস্ত ধরণের লোক’ ছিলেন না – হয়তো কেউ কেউ হাসাহাসি করেছিল কিন্তু বেশিরভাগ লোক এইসব দেখে অবাক বা মুগ্ধ হয় এবং তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
  • বাসায় ফিরে এলে শৌলের কাকা তাকে নির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করেন, ভাববাদী শমূয়েল ঠিক কি বলেছিলেন, হয়তো তার এই বিষয় সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ ছিল। কিন্তু শৌল তাকে আসল বিষয় জানান না। সব কিছু সাথে সাথে ঘোষণা না করা, তা কি প্রজ্ঞার কাজ ছিল (১ শমূয়েল ১০:১৪-১৬)? না তা ছিল ভয়ের বিষয়? বা সন্দেহের বিষয়? বা হীন্যতার বিষয়? বা তিনি এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করার জন্আয আরো সময় চেয়েছিলেন? আমরা জানি না।
  • শমূয়েলের নির্দেশনার শেষ অংশ ছিল: “এই সব চিহ্ন ঘটলে পর তোমার তখন যা করা উচিত তুমি তা-ই কোরো; ঈশ্বর তোমার সংগে থাকবেন। “তুমি আমার আগে নেমে গিল্‌গলে যাও। আমি পোড়ানো ও যোগাযোগ-উৎসর্গের অনুষ্ঠান করবার জন্য তোমার কাছে আসছি। আমি না আসা পর্যন্ত তুমি সাত দিন আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি এসে বলব তোমাকে কি করতে হবে” (১ শমূয়েল ১০:৭-৮)।
শৌলকে রাজা হিসাবে বাছাই করা
  • শমূয়েল সারা ইস্রায়েল মিসপা শহরে ডেকে তিনি তাদেরকে আর একবার বলেন যে, রাজাকে চাওয়া মানে ঈশ্বরকে অগ্রহ্য করা। কিন্তু তিনি গুলিবাটের প্রক্রিয়ায় ঈশ্বর দ্বার নিযুক্ত লোককে দেখাতে যাচ্ছেন। বংশদের মধ্যে বিন্যামিন ধরা পড়ে, বিন্যামিন গোষ্ঠির মধ্যে মট্রীয়ের পরিবার ধরা পড়ে, মট্রীয়ের পরিবারের মধ্যে শৌল ধরা পড়ে (১ শমূয়েল ১০:১৭-২১)।
  • জেনে কি ঘটতে যাচ্ছে, শৌল নিজেকে মাল-পত্রের মধ্যে লুকায়। তার অবশ্যই ভয় লাগে, তিনি বুঝতে পারেন এই ঘটনার গুরুত্ব ও দায়িত্বভার কি, কিন্তু সাথে তিনি হতে পারে উত্তেজনা ও আনন্দও উপলব্দি করেন, কারণ ঈশ্বর যা বলেছেন, তা বাস্তবে ঘটতে যাচ্ছে! (১ শমূয়েল ১০:২১-২৩)।
  • তারা শৌলকে মাল-পত্রের মধ্যে খুঁজে পায়। শৌল সবার চেয়ে লম্বা এবং তার চেহারা দেখে সবাই খুশি। ঈশ্বর যা আগে থেকে বলেছিলেন লোকেরা এখন তাতে রাজি হয়। তারা জোরে বলল “রাজা চিরজীবী হোন” (১ শমূয়েল ১০:২৪)। লোকেরা শৌলের নিযুক্তকরণে রাজি বলে শৌল আসলে রাজা হিসাবে অনুমোদন ও রাজত্ব করার অধিকার পান (দ্বিতীয় বিবরণ ১:১৩-১৪)।
  • শমূয়েল সাথে সাথে “রাজ্য শাসনের নিয়ম-কানুনগুলো” বা “রাজার অধিকার ও দায়িত্ব” লিখিত রাখেন (দ্বিতীয় বিবরণ ১০:২৫)। হতে পারে শমূয়েল তা দ্বিতীয় বিবরণ ১৭:১৪-২১ পদে ঈশ্বরের আদেশ অনুসারে লেখেন এবং “ঈশ্বরের সামনে রাখলেন”, যা হতে পারে মিলন-তাম্বু বুঝায়। রাজার অধিকার ও দায়িত্ব কি কি, তা এভাবে ঈশ্বরের চোখের সামনে এবং সারা ইস্রায়েল জাতির চোখের সামনে রাখা হয়, যার অর্থ এই যে, রাজা অবশ্যই আইনের অধীনে এবং ঈশ্বরের ও জাতির কাছে দায়বদ্ধ আছেন।
  • সবাই যে শৌলকে নিয়ে খুশি, এমন নয়: “কিন্তু কতগুলো বাজে লোক বলল, এই লোকটা কি করে আমাদের রক্ষা করবে?” তারা তাঁকে তুচ্ছ করল এবং কোন উপহার দিল না। শৌল কিন্তু মুখ বন্ধ করে রইলেন” (১ শমূযেল ১০:২৭)। এখানে আমরা শৌলের ভালদিকে দেখতে পাই। তিনি অপমানিত হন না, প্রতিশোধ নেন না। হয়তো তার হীনমন্যতার কারণে তার আসলে একই লাগে, যদিও তিনি তা প্রকাশ করেন না। হয়তো তিনি ভাল প্রতিক্রিয়া দিয়ে নিজেকে তাদের কাছে প্রমাণিত করতে চান। পরবর্তীতে শৌল সহজে অপমান বোধ করবে এবং অল্পতে প্রতিশোধ নেবেন।
  • শৌল নিজের শহরে, অর্থাৎ গিবেয়ায় ফিরে যান এমন সেনাদের নিয়ে যান “যে সব বীর পুরুষদের অন্তরে ঈশ্বর সাড়া জাগিয়েছিলেন”। ঈশ্বর শৌলকে শুরু থেকে কিছু সমর্থনকারী ও সাহায্যকারী দান করেন, যাদের উপর তিনি নেতৃত্ব চর্চা করতে পারেন, যাদের তিনি প্রথম বড় চ্যালোঞ্জ এসে কাজে লাগাতে পারেন (১ শমূয়েল ১০:২৬)।
  • শৌলের রাজত্বের শুরুর তারিখ দেওয়া সহজ না, কারণ ১ শমূয়েল ১৩:১ পদে তারিখ দেওয়া বিষয়ে লেখায় কিছু খালি স্থান আছে “শৌল […] ও দুই বৎসর ইস্রায়েল দেশে রাজত্ব” করেন। তবুও প্রেরিত ১৩:২১ পদে বলা হয়েছে যে শৌল ৪০ বছর ইস্রায়েলের উপর রাজত্ব করেছিলেন। সিংহাসনে ওঠার বছর এবং মৃত্যুর বছর যোগ করলে তা ৪২ বছর হয়ে যায়। সাধরণত শৌলের রাজত্বের তারিখ হিসাবে ১০৫০-১০১১ খ্রীষ্টপূর্বে ধরা হয়।
অম্মোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং রাজা হিসাবে আর একবার অনুমোদন দান
  • শৌলের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ আসে যখন তিনি শোনেন যে, অম্মোনীয় রাজা নাহশ গাদ গোষ্ঠির এলাকার যাবেশ-গিলিয়দ শহরকে ধ্বংস এবং লোকদের চোখ নষ্ট করার হুমকি দেন (১ শমূয়েল ১১:১-৪)।
  • এক দিন গরুর পাল নিয়ে আসার সময়ে শৌল এই খবর পান। তিনি খবর ভাল করে জেনে নেন, এবং লোকদের দুর্দশা শুনে যত্ন নেন। ঈশ্বরের আত্মা শৌলের উপরে আসার পর তিনি রেগে গিয়ে সব গোষ্ঠির কাছে খবর পাঠান যেন তারা অস্ত্র নিয়ে “শৌল ও শমূয়েলের সঙ্গে” এগিয়ে আসে (১ শমূয়েল ১১:৫-৭)।
  • ঈশ্বর শৌলকে সেই প্রথম চ্যালেঞ্জের সময়ে সাহায্য করেন যেন যা তার লাগে, তিনি তা-ই পেতে পারন “সদাপ্রভু ইস্রায়েলীয়দের মনে একটা ভয় জাগিয়ে দিলেন, আর তারা সবাই এক হয়ে বের হয়ে আসল” (১ শমূয়েল ১১:৭)। ফলে তিনি ১২ গোষ্ঠি থেকে ৩ লক্ষ্য সেনা পান (১ শমূয়েল ১১:৮)।
  • শৌল তার প্রথম যুদ্ধে ইস্রায়েলের সেনারা যুদ্ধে জয় করতে এবং যাবেশ-গিলিয়দ মুক্ত করতে সক্ষম হন। যাবেশ-গিলিয়োদের লোকেরা শৌলের এই উদ্ধার আর কখনও ভুলবে না (১ শমূয়েল ১:১-১৩)।
  • ঈশ্বর শৌলকে ইস্রায়েলীয়দের চোখের সামনে এই গুরত্বপূর্ণ প্রথম জয় দান করেন। এভাবে শৌল ইস্রায়েলের সবার কাছে রাজা হিসাবে প্রমাণিত। এইটা হল শৌলের চরম মুহূর্তে, তার রাজত্বের শীর্ষ।
  • রাজা হিসাবে শৌলের নিযুক্তকরণ নিশ্চিত করার জন্য ভাববাদী শমূয়েল সবাইকে গিলগল শহরে ডাকেন এবং সেখানে তারা আনন্দের সঙ্গে এই জয় ও শৌলের রাজত্ব উৎযাপন করে (১ শমূয়েল ১১:১৪-১৫)। যারা আগে তার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, শৌল তাদেরকে লজ্জা দেন না বা তাদের বিরুদ্ভধে ভয়ংকর কিছু ঘটান না, বরং তিনি ঈশ্বরকে গৌরব দেন। এখানে শৌলের উদারতা ও বড় মন দেখা যায় এবং তিনি আসলে জনপ্রিয় (১ শমূয়েল ১১:১৩)।
  • এরপরে শমূয়েল সারা ইস্রায়েলকে আর একবার মিসপা শহরে ডেকে একত্রিত করেন এবং তার বিদায় বক্তৃতা দেন: তিনি তাদের আর একবার রাজা চাওয়ার জন্য ধমক দেন, কিন্তু তিনি তাদেরকে উৎসাহিত করেন যে, তারা ব্যক্তিগতভাবে যদি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত হয় তবে ঈশ্বর তাদেরকে আশীর্বদা করবেন (১ শমূয়েল ১২:১-২৪)। শমূয়েল এখানে বিচারক হিসাবে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য নিজেকে লোকদের কাছে দায়বদ্ধ করে দুরনীতি থাকলে তাদেরকে অভিয়োগ করতে বলেন।
  • ভাববাদী শমূয়েল এখানে আর একবার চমৎকার আদর্শ দেখান: তিনি ক্ষমতা ধরে না রেখে বরং তার রাজনৈতিক ভূমিকা সুন্দরভাবে শৌলের কাছে হস্তান্তর করেন, তিনি নিজেকে আইনের অধীনে দায়বদ্ধ করেন এবং ঈশ্বরের উপর নির্ভর করেন।
পলেষ্টীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং রাজপরিবারের স্থিরতা হারানো
  • পরবর্তী বড় চ্যালঞ্জ ঘটে যখন পলেষ্টীয়রা শৌলের ছোট সৈন্যদলকে (৩০০০ সেনা মাত্র) তাদের ৩০০০ রথ, ৬০০০ রথের চালক এবং অসংখ্য সেনা দিয়ে আক্রমণ করেন।
  • এই ঘটনা হল শৌলের নেতৃত্বের ও চরিত্রের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি একটি ভয়ংকর যুদ্ধের সম্মুখে, তিনি ভাববাদী শমূয়েলের অপেক্ষায় এবং সাহস হারিয়ে দিনে দিনে সেনারা পালিয়ে চলে যাচ্ছে। এই হতাশার মুহূর্তে শৌল যুদ্ধের জন্য করা উৎসর্গগুলো নিজের হাতে উৎসর্গ করেন।
  • এখানে বুঝা যায় যে, শৌল বাধ্যতার চেয়ে ধর্মীয় অনুশিলনে এবং সদাপ্রভুর ভক্তিপূর্ণ ভয়ের চেয়ে ধর্মকর্মের উপর নির্ভর করেন। এছাড়া, মোশির আইন-কানুন অনুসারে যুদ্ধের আগে ভিত সেনাদের বিদায় দেওয়া উচিত, কাউকে জোর করে যুদ্ধে নামানো উচিত না (দ্বিতীয় বিবরণ ২০:৮)।
  • শমূয়েল, যিনি এখন পুরোহিতের ভূমিকা পালন করেন, শেষে পৌঁছান এবং শৌলের উৎসর্গ দেখে রাগান্বিত হয়ে শৌলকে ধমক দেন: তিনি সদাপ্রভুকে ডাকেন কিন্তু তাঁর আইন-কানুনে অবাধ্য হন, কারণ শুধুমাত্র পুরোহিতদের জন্য উৎসর্গ দান করার অনুমোদন ছিল। রাজা যদি তা-ই করেন তিনি রাজনৈতিক নেতা হিসাবে আত্মিক নেতৃত্বের ভূমিকা দখল করেন।
  •  শৌল উত্তরে বলেন যে, তিনি “ইচ্ছা না থাকলেও আমি পোড়ানো-উৎসর্গের অনুষ্ঠান করলাম” (১ শমূয়েল ১৩:১১-১২)। কথাটি অবশ্যই একরকম সৎ কথা বলা যায়, কিন্তু তাতে কোন অনুতাপ নেই।
  • “শমূয়েল বললেন, “তুমি বোকার মত কাজ করেছ। তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু যে আদেশ তোমাকে দিয়েছিলেন তা তুমি পালন কর নি। যদি তুমি তা করতে তবে ইস্রায়েলের উপর তোমার রাজত্ব তিনি চিরকাল স্থায়ী করতেন। কিন্তু এখন তোমার রাজত্ব আর বেশী দিন টিকবে না। সদাপ্রভু তাঁর মনের মত একজন লোককে খুঁজে নিয়েছেন এবং তাঁকেই তাঁর লোকদের নেতা নিযুক্ত করেছেন, কারণ তাঁর আদেশ তুমি পালন কর নি” (১ শমূয়েল ১৩:১৩)। শৌরলে রাজপরিবার যে স্থির থাকবে, এখানে শৌল এই প্রতিজ্ঞটি হারান, তবুও তিনি রাজত্ব করার অধিকার হারন না। শৌলের অনুতাপের কোন উল্লেখ নেই।
  • গিলগল, শৌলের চরম মুহূর্তের ও সবচেয়ে বড় জয়ের স্থান, এখন তার ব্যর্থতার স্থানে পরিণত হয়!
  • ১ শমূযেল ১৩:১৯-২২ পদে লেখক বুঝায় যে, পলেষ্টীয়রা নিজেদের জন্য লোহার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে কিন্তু তারা নিশ্চিত করে যে, ইস্রায়েল এই প্রযুক্তি না পায়। তাই পলেষ্টীয়রা ‘লোহার যুগে’ উঠে এসেছে, কিন্তু ইস্রায়েল এখনও ব্রোঞ্জ যুগে রয়ে গেছে। তাই শৌলের শুধুমাত্র সামান্য একটি সৈন্যদল আছে, এছাড়া তাদের মাত্র ২টি লোহার তলোয়া আছে!
  • পরবর্তী যুদ্ধে শৌলের দুর্বলতাগুলো দেখা দিতে শুরু করে: ভয়, সাহসের সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতা, নিয়ম-সিন্দুক তাবিজের মত ব্যবহার করা, শপথ দাবি করা, অতিরিক্ত শাস্তি বিস্তার করতে চেষ্টা করা ইত্যাদি। তার অন্তরের দুর্বলতা, অস্থিরতা ও শক্তিহীনতা প্রকাশ পায়, নিজের কথায় বা সিন্ধান্তে বিশ্বস্ত থাকার ক্ষমতার অভাবও দেখা যায়।
  • শৌলের প্রথম ছেলে যোনাথন তার বাবার চেয়ে অনেক ভিন্ন। তার বিশ্বাস আছে, সাহস, আশা, অন্য একটি দৃষ্টভঙ্গি, সাধরণ বুদ্ধি ও ঈশ্বরের উপরে নির্ভরতা। তিনি দুসাহসের সঙ্গে একটি যুদ্ধ ঘটিয়ে দেন এবং তা একটি বড় জয়ে পরিণত হয় (১ শমূয়েল ১৪)।

অমালেকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও রাজত্ব করার অধিকার হারানো

  • শৌলের রাজত্ব যত আগায় তত তিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে সরে যান। তার দ্বিতীয় বড় অবাধ্যতা অমালেকীয়দের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে।
  • শমূয়েল তাকে অমালেকীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলেছেন, তাদেরকে মেরে ফেলতে এবং লুট না করতে বলেনছেন। শৌল যুদ্ধে ঠিকই জয় করেন কিন্তু যখন তার সেনারা লুট করতে চায়, তিনি তা প্রতিরোধ করেন না। ঈশ্বরের একটি অপ্রিয় নিয়মে বাধ্য হওয়ার চেয়ে তিনি সেনাদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে চান।
  • তখন সদাপ্রভুর এই বাক্য শমূয়েলের কাছে প্রকাশিত হল, “শৌলকে রাজা করাটা আমার দুঃখের কারণ হয়েছে, কারণ সে আমার কাছ থেকে সরে গেছে এবং আমার আদেশ অমান্য করেছে।” এই কথা শুনে শমুয়েল উত্তেজিত হলেন এবং গোটা রাতটা তিনি সদাপ্রভুর কাছে কান্নাকাটি করে কাটালেন” (১ শমূয়েল ১৫:১০-১১)।
  • যুদ্ধের পরে শমূয়েল তার সাথে দেখা করে শৌল ঘোষনা করেন যে, তিনি ঈশ্বরের আদেশ ঠিকই পালন করেছেন। চ্যালেঞ্জ পেয়ে তিনি অজুহাত দেখিয়ে তার সেনাদেরকে দোষ দেন।
  • গিলগল, শৌলের চরম মুহূর্তের ও সবচেয়ে বড় জয়ের স্থান, এখন দ্বিতীয় বার তার ব্যর্থতার স্থানে পরিণত হয়!
  • “শমূয়েল তখন শৌলকে বললেন, “চুপ কর। গত রাতে সদাপ্রভু আমাকে যা বলেছেন তা আমি তোমাকে বলি।”… “একদিন তুমি নিজের চোখে খুবই সামান্য ছিলে, কিন্তু তবুও কি তুমি ইস্রায়েলীয়দের সমস্ত গোষ্ঠীর মাথা হও নি? সদাপ্রভুই তোমাকে ইস্রায়েল দেশের উপরে রাজা হিসাবে অভিষেক করেছেন। তিনি তোমাকে একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘তুমি গিয়ে সেই পাপীদের, অর্থাৎ অমালেকীয়দের একেবারে শেষ করে ফেলবে। তারা একেবারে শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগে যুদ্ধ করবে।’ তুমি সদাপ্রভুর আদেশ পালন কর নি কেন? কেন তুমি লুটের জিনিসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে এবং সদাপ্রভুর চোখে যা খারাপ তা-ই করলে?” (১ শমূয়েল ১৫:১৬-১৯)।
  • শমূয়েল আসল সমস্যাটি তুলে ধরেন: হীনমন্যতা, নিজেকে ছোট মনে করা, জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রচেষ্টা, সদাপ্রভুর ভক্তিপূর্ণ ভয়ের বিষয়ে আপোষ করা, বাধ্য না হয়ে বরং ধর্মকর্ম করা। ঈশ্বরের সঙ্গে তার সত্যিকারের সম্পর্ক নেই।
  • শৌল শেষ পর্যন্ত চেতনা গ্রহণ করেন না, দায়িত্বও গ্রহণ করেন না, তিনি পাপ স্বীকারও করেন না, ঈশ্বরকে ভয় করেন না বরং মিথ্যায় আশ্রয় নিয়ে বলেন যে, তিনি সব ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গের জন্য নিয়েছিলেন।
  • “তখন শমূয়েল বললেন, “সদাপ্রভুর আদেশ পালন করলে তিনি যত খুশী হন, পোড়ানো-উৎসর্গ ও পশু-উৎসর্গে কি তিনি তত খুশী হন? পশু-উৎসর্গের চেয়ে তাঁর আদেশ পালন করা আর ভেড়ার চর্বির চেয়ে তাঁর কথার বাধ্য হওয়া অনেক ভাল। বিদ্রোহ করা আর গোণাপড়ার কাজ করা একই পাপ; অবাধ্যতা আর প্রতিমাপূজা একই অন্যায়। তুমি সদাপ্রভুর আদেশ অগ্রাহ্য করেছ তাই তিনিও তোমাকে রাজা হিসাবে অগ্রাহ্য করেছেন” (১ শমূয়েল ১৫:২২-২৩)।
  • ঈশ্বর কোন বড় ধর্মকর্ম বা উৎসর্গ চান না, বরং তিনি চান ঈশ্বরের ভক্তিপূর্ণ ভয় ও তাঁর কথার প্রতি বাধ্যতা।
  • শৌলের অজুহাত পরিবর্তন হয়ে যায়, তা আর ‘মনে করেছি ঠিক করেছিলাম’ না বরং ‘কেন এতে বাধ্য হব?’ তিনি আর বলেন না ‘দুঃখিত, ভুল হয়েছে’, তার মনোভাব এর চেয়ে ‘কেন ঈশ্বর এই বিষয়ে মশা থেকে হাতি বানাছেন?’ তিনি মনে করেন, ঈশ্বরের দাবি মুর্খ বা অপ্রয়োজন, ঈশ্বরই সমস্যা।
  • দুঃখের বিষয় যে, শৌল ইতিমধ্যে স্থায়ী রাজপরিবারের প্রতিজ্ঞা হারিয়েছে, এখন তিনি ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও রাজত্ব করার অধিকার হারান।
  • অবশেষে তিনি – ফলাফল বুঝে – কিছুটা পাপ স্বীকার করেন: “আমি পাপ করেছি। সদাপ্রভুর আদেশ আর আপনার নির্দেশ আমি সত্যিই অমান্য করেছি। লোকদের ভয়ে আমি তাদের কথামতই কাজ করেছি” (১ শমূয়েল ১৫:২৪)।
  • তিনি মনে করেন এতদূর বললে ঈশ্বরের ও শমূয়েলের খুশি হওয়ার কথা। তিনি বলেন “এখন আমার প্রতি দয়া করে আমার পাপ আপনি ক্ষমা করে দিন, আর আমার সংগে চলুন যাতে আমি সদাপ্রভুর উপাসনা করতে পারি।”
  • কিন্তু শমূয়েল রাজি না, তিনি বলেন“তুমি সদাপ্রভুর আদেশ অগ্রাহ্য করেছ”। শৌল শমূয়েলের কাপড় টেনে ধরেন আর তা ছিড়ে যায়, কিন্তু শমূয়েল তাতে রূপক অর্থে ব্যবহার করে শৌলকে বলেন যে, রাজত্ব আজ তার কাছ থেকে ছিড়ে নেওয়া হয়েছে।
  • শৌল এখন আর একটু গুরুত্ব দিয়ে বলেন: “আমি পাপ করেছি; তবুও আমার অনুরোধ এই যে, আমার জাতির বৃদ্ধ নেতাদের ও ইস্রায়েলীয়দের সামনে আমার সম্মান রাখুন। আমি যাতে আপনার ঈশ্বর সদাপ্রভুর উপাসনা করতে পারি সেইজন্য আপনি আমার সংগে চলুন” (১ শমূয়েল ১৫:২৫-৩১)।
  • তবুও শৌলের এই কথায় তার অনুতাপের হালকা ভাব প্রকাশিত। তিনি বোঝেন না, কেন ঈশ্বর এই বিষয়টি বড় বিষয় মনে করেন, তিনি ঈশ্বরের বিচার বোঝেন না, তাতে রাজিও না। তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হল, বিষয়টি ইস্রায়েলের প্রাচীনদের চোখে দেখতে কেমন হবে।
  • তিনি ঈশ্বরকে আরাধনা করেন কারণ নিজের ব্যক্তির প্রতি ইস্রায়েলের বাধ্যতা আনার জন্য তিনি তা প্রয়োজন মনে করেন। শমূয়েল তার কেন এত প্রয়োজন? কারণ শমূয়েল দ্বারা তিনি রাজা হিসাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও অধিকার পান।
  • শৌলের একটি কথা বিশেষভাবে চোখে পড়ে্, তিনি বলেন: ”আপনার ঈশ্বর”, অর্থাৎ শমূয়েলের ঈশ্বর, কিন্তু শৌলের ঈশ্বর না (১ শমূয়েল ২১,৩০)। এই দুঃখজনক কথা দ্বারা শৌলের চিন্তা ও মনোভাব আরো প্রকাশ পায়: তিনি মনে করেন, তিনি একজন অতি দাবিকারী ঈশ্বরেরই কারণে আটকে পড়েছেন, তিনি ঈশ্বরকে বোঝেন না, তাকে খুশি করতে জানেন না, তাকে বাদও দিতে পারেন না।
  • “শমূয়েল যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তিনি শৌলের সংগে আর দেখা করেন নি। ইস্রায়েলীয়দের উপর শৌলকে রাজা করাটা সদাপ্রভুর দুঃখের কারণ হয়েছিল বলে শমূয়েল তাঁর জন্য দুঃখ করতেন। … পরে সদাপ্রভু শমূয়েলকে বললেন, “আমি শৌলকে ইস্রায়েলীয়দের রাজা হিসাবে অগ্রাহ্য করেছি, কাজেই তুমি আর কতকাল তার জন্য দুঃখ করবে? এখন তুমি তোমার শিঙায় তেল ভরে নিয়ে বেরিয়ে পড়। আমি তোমাকে বৈৎলেহম গ্রামের যিশয়ের কাছে পাঠাচ্ছি” (১ শমূয়েল ১৫:৩৫-১৬:১)। শোল এখন তার আত্মিক নেতা, সমর্থনকারী বা ক্রাচ্ থেকে বঞ্চিত। তিনি ঈশ্বরের আর কোনো নির্দেশনা পাবেন না, কারণ হতে পারে তিনি সেগুলো যেকোনোভাবে মানেন নি। শৌলের কোন নিজস্ব ‘আত্মিক জীবন’ বা ‘অন্তরে ভক্তি’ নেই, যদিও দায়ূদের জীবনে তা ঠিকই দেখা যায়, যিনি ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কে আছেন এবং নিজেই ঈশ্বরের শুনতে থাকেন। শৌল আসলে এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে শমূয়েলের উপর নির্ভর করেছেন, যিনি তার জন্য ভাববাদী ও পুরোহিত ভূমিকা পালন করেছেন (১ শমূয়েল ১৪:৩৬)।
  • শৌলের এখানে কি করা উচিত ছিল? তার মনে-প্রাণে অনুতপ্ত হওয়ার কথা ছিল, তার ঈশ্বরের বিচার মেনে নেওয়ার এবং এর উপযুক্ততা স্বীকার করা উচিত ছিল। তার কাছ থেকে রাজত্ব তুলে নেওয়া হয়েছে বলে তার ঈশ্বর দ্বারা নিযুক্ত লোককে নেতৃত্বে বৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল এবং শেষে একটি শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরে তার উপর রাজত্ব করার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
  • শৌল এতে কোনোভাবেই রাজি হবে না। প্রকৃতপক্ষে তিনি তা স্বক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করে যখন ঈশ্বর তা-ই করেন, তিনি তার প্রতিযোগীকে অবশ্যই মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন। কিন্তু শৌলের বড় ছেলে যোনাথন ঠিক তা-ই করেন: তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে নিয়ে নতুন অভিষিক্ত নেতাকে সমর্থন করেন, যদিও তিনি নিজেই রাজপদ থেকে বঞ্চিত হবেন।
দায়ূদের সাথে দ্বন্দ্বে শৌলের অবনতি
  • শৌল ধীরে ধীরে খারাপ থেকে আরো খারাপে চলে যাচ্ছেন। শৌলের আচরণের কারণে পবিত্র আত্মা তাকে ছেড়ে চলে যান এবং মন্দ আত্মার জন্য স্থান তৈরি হয়। লেখক এই মন্দ আত্মাকে
    “ঈশ্বরের কাছ থেকে” বলেন (১ শমূয়েল ১৬:১৪) এবং আত্মাটি শৌলকে অত্যাচার করে।
  • কিভাবে সম্ভব যে, ঈশ্বরের কাছ থেকে একটি মন্দ আত্মা এখানে কাজ করে? এই কথায় অনেকে বিগ্ন পায়। কিন্তু আসলে এর অর্থ মাত্র এই যে, ঈশ্বর যা বাস্তব বলেছেন, তা অনুসারে ঘটে: মানুষ যদি ঈশ্বরকে অগ্রাহ্য করতে থাকে তবে তারা মন্দকে নিজের মধ্যে স্থান পেতে দেয়। ঈশ্বর যেমন মানুষের সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ করেন না, তিনি এটাও সরাসরি প্রতিরোধ করেন না। অত্যাচার হয়তো শৌলকে ঈশ্বরের দিকে তাড়ানো উচিত ছিল।
  • দায়ূদের গানে শৌল এই আত্মা থেকে রেহাই পান (১ শমূয়েল ১৬:২২-২৩)। ঈশ্বর শৌলের চোখের সামনে এমন একজনকে রাখেন, যিনি শৌলকে দেখাতে পারেন, তার আসলে কি দরকার আছে: ঈশ্বরের উপস্থিতি, সদাপ্রভুর ভক্তি, বাধ্যতা, অন্তরে আত্মিক জীবন।
  • শৌলকে অনেক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যেন তিনি কিছু শেখেন ও সাড়া দেন, কিন্তু তিনি অনবরত চেতনার ডাক এবং ঈশ্বরের রব অগ্রাহ্য করতে থাকেন। বরং তিনি ধীরে ধীর নিজের মন হিংসা, ক্ষোভ, হিংস্রতা ও খুনে সমর্পিত করেন।
  • যখন দায়ূদ পলেষ্টীয়দের বীরযোদ্ধা গলিয়াৎকে মেরে ফেলেন (১ শমূয়েল ১৭) এবং শৌলের ছেলে যোনাথন ও দায়ূদের মধ্যে একটি গভীর বন্ধুত্ব শুরু হয়।
  • শৌল শুরুদিকে দায়ূদকে ভালবাসেন (১ শমূয়েল ১৬:২১) এবং তাকে সৈন্যের প্রদান নেতা হিসাবে নিযুক্ত করেন, একটি সিদ্ধান্তে যাতে সবাই খুশি (১ শমূয়েল ১৮:৫)। কিন্তু যখন দায়ূদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, শৌল নিজেকে তার সাথে তুলনা করতে শুরু করে এবং নিজের মন হিংসায় দিয়ে দেন (১ শমূয়েল ১৮:৬)।
  • শৌল দায়ূদকে ভয় পান (১ শমূয়েল ১৮:১২,২৯) ও তার বিষয়ে মুগ্ধ হন (১ শমূয়েল ১৮:১৫), দায়ূদ হন যা শৌলের হওয়ার কথা ছিল, যা শৌল হতে পারতেন – একজন সফল নেতা যার সাথে ঈশ্বরের উপস্থিতি ও দয়া থাকে।
  • শৌল চেতনার রব অগ্রাহ্য করতে থাকেন এবং এভাবে শৌল নিজেকে প্রতিদ্বান্দ্বিতায়, হিংসায়, রাগে, ক্ষোভে, হিংস্রতায় এবং শেষে খুন করার প্রচেষ্টায় পড়তে দেন।
  • শৌল দু’বার দায়ূদকে গান করার সময় প্রায় মেরে ফেলেন (১ শমূয়েল ১৮:১১), যা ‘হতাশার ফল’ বলে কোন সমাধানের আনা হয় না।
  • পরবর্তীতে শৌল দায়ূদকে পলেষ্টীয়দের হাত দিয়ে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেন (তিনি তার মেয়ের যৌতুক হিসাবে ১০০জন পলেষ্টীয়দের পুরুষাংগে সামনের চামড়া দাবি করেন), কিন্তু এই কৌশলও নিষ্ফল হয়ে যায় কারণ দায়ূদ বেঁচে যান (১ শমূয়েল ১৮:২০-২৯)।
  • যখন শৌল সরাসরি দায়ূদকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেন তখন যোনাথন তাকে বিভিন্নভাবে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তার মাথা আবার ঠাণ্ডা করে দেন (১ শমূয়েল ১৯:১-৭)। শৌল যোনাথনের কাছে শপথ করেন যে, তিনি দায়ূদের বিরুদ্ধে কিছু করবেন না, কিন্তু শৌল এই শপথ শেষে ভেঙ্গে দেন।
  • তৃতীয় বার যখন শৌল দায়ূদকে বাজনা বাজার সময়ে বর্শা দিয়ে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেন, দায়ূদ অবশেষে শৌলের মেয়ে, অর্থাৎ তার স্ত্রী মীখলের কৌশলে পালিয়ে যান। শৌল যখন দায়ূদকে “আমার শত্রু” বলে মীখলকে চ্যালেঞ্জ করেন, তখন মীখল মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেন যে, দায়ূদ তাকে হুমকি দিয়ে বাধ্য করিয়েছেন। যোনাথন সত্য কথা বলে দায়ূদকে সাহায্য করতে চেষ্টা করেন, মীখল মিথ্যা দিয়ে তা চেষ্টা করে।
  • শৌল যখন খবর পান যে, দায়ূদ শমূয়েলের কাছে পালিয়ে গেছেন, তখন তিনি দু’বার তাকে ধরার জন্য সেনাদল পাঠান, কিন্তু শমূয়েল ও তার অধীনে ভাববাদী দলের কাছে পৌঁছিয়ে সেনারাও পবিত্রা আত্মার অধীনে পড়ে। শেষে শৌল নিজেই শমূয়েলের কাছে যান কিন্ত তিনিও পবিত্র আত্মার অধীনে পড়েন ও ভাববাণী বলতে শুরু করেন (১ শমূয়েল ১৯:২৮)।
  • এই ‘অতি বিশেষ’ গল্প দেখায় যে, ঈশ্বর এখনও শৌলের হৃদয় স্পর্শ করতে চেষ্টা করেন, অলৌকিক ঘটনা দ্বারা, পবিত্র আত্মার স্পর্শ দ্বারা (১ শমূয়েল ১৯:২৩), তাকে নিজের আহ্বান স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যখন সব কিছু নতুন ও চমৎকার ছিল (১ শমূয়েল ১০:১০)। ঈশ্বর শৌলকে নিজের কাছে এবং সম্পর্কে ফিরে আনার জন্য অত্যন্ত চেষ্টা করেন।
  • ঈশ্বর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শৌলকে আর একবার জানান যে, তিনি দায়ূদকে ভুল বিচার করেন, যে ঈশ্বর নিজেই দায়ূদকে সুরক্ষা করেন (ঘটনা দিয়ে তা কত পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত!) এবং যে, তিনি – শৌল – এখনও অন্য একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু শৌল চেতনা ও ঈশ্বরের রব অগ্রাহ্য করতে থাকেন।
  • দায়ূ যোগাথনকে জিজ্ঞাসা করেন কোন কারণে তাকে মেরে ফেলার প্রচেষ্টা চলছে। যোনাথন, যিনি এখনও নিশ্চিত যে, তার বাবা শৌল তার কাছে সৎ কথা বলেন, তিনি খুনের পরিকল্পনা অস্বীকার করেন, কিন্তু যেহেতু বিষয়টি দায়ূদের জন্য হুমকিস্বরূপ, যোনাথন বিষয়টি পরীক্ষায় আনতে রাজি (১ শমূয়েল ২০:১-১০)। যোনাথন এখানে এখনও তার বাবার সততায় বিশ্বাসী, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, শৌলের পরিবর্তন ছিল খুব ধীরে ধীরে।
  • কিন্তু দেখা যায় যে, শৌল এখন তার সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য সন্তানকেও প্রতারণা করতে চেষ্টা করেন। শৌলের চারিপাশে বেশি সত্য বলার লোক বা রব আর নেই, শৌল এখানে আর একটি সত্য রব থেকে নিজেকে বন্ধ করে রাখেন, তিনি আবারও সত্যের চেয়ে মিথ্যা ও ন্যায় কাজের চেয়ে অন্যায় কাজে নিজেকে সমর্পিত করেন। শৌল নিজের অন্তর একটি ‘খুনীদের গুহা’ বানান।
  • যেমন দায়ূদের সাথে রাজি হয়েছিলেন, যোনাথন ঠিক তেমনি তার বাবাকে পরীক্ষা করেন। শৌল শুধুমাত্র দায়ূদকে খুন করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন না, তিনি নিজের ছেলেকে (এবং তার মাকে) খুব বাজেভাবে অপমানিত করেন এবং তাকে এমন কি বর্শা দিয়ে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেন (১ শমূয়েল ২০:৩০-৩১)।
  • তার পরিকল্পনা আবারও নিষ্ফল হয়েছে, এই রাগে শৌল নিজেকে সরাসরিভাবে প্রকাশ করেন: “যতদিন যিশয়ের ছেলে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে ততদিন তুই স্থির থাকবি না, তোর রাজ্যও স্থির থাকবে না। কাজেই এখনই লোক পাঠিয়ে তাকে আমার কাছে নিয়ে আয়, তাকে মরতেই হবে” (১ শমূয়েল ২০:৩১)।
  • শৌল ক্ষমতা ধরে রাখতে থাকেন এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা আবারও অগ্রহ্য করেন। তিনি এখানে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেন যে, তিনি নিজের ছেলের জন্যই তা করেন, কিন্তু এই মুখোশ খুব তাড়াতাড়ি পড়ে যায়: যে ছেলের জন্য তিনি ব্যবস্থা নিতে ভান করেন, সেই ছেলেকে তিনি প্রায় মেরে ফেলেন। শৌল সত্য ও বিশ্বস্ততা নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু তার জীবন সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেছে।
  • আর একটি বিষয় প্রকাশ পায়: শৌল মনে করেন যে তিনি তার ছেলেকে খুনে রাজি করাতে পারেন “তাকে আমার কাছে নিয়ে আয়”, । এটি থেকে আমরা বুঝতে পারি, শৌল নিজের ছেলেকে একদম জানেন না। তিনি নিজের মন-মানসিকতা, চরিত্র ও আচরণ তার ছেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বা যুক্তিভিত্তিক মনে করেন (সবাই তো তা-ই করত!)। তিনি নিজের হৃদয় এমনভাবে ঘৃণায় ও নৈতিক ক্ষয়ে সমর্পিত করেছেন যে, তিনি আর বোঝেন না তা অনৈতিক – এবং তিনি মনে করেন যোনাথন এবং সবাই তার মত করত। অন্য একটি পথ যে থাকে, তা তিনি আর জানেন না।
  • এমন কি এই সময়েও যোনাথন আর একবার তার বাবার বিচার বুদ্ধি ও সততাকে ডেকে কথা বলেন: “কেন তাকে মরতে হবে? সে কি করেছে?” (১ শমূয়েল ২০:৩২)। যারা নিজেই বিশ্বাসযোগ্য, তারা সহজে অন্যদের অবিশ্বস্ত মনে করে না। এখানে আমরা যোনাথনের চরিত্রের সৌন্দর্য দেখতে পাই।
  • আর কোন সন্দেহ নেই, আর কোনো ভান নেই, আর কোনো ন্যায্যতা নেই: এখন থেকে দায়ূদকে হরিণের মত শিকার করা হবে।
শৌল দায়ূদকে শিকার করেন এবং আরো খারাপে পড়েন
  • দায়ূদ পালানোর সময়ে নোব শহরে মিলন-তাম্বু থেকে পুরোহিতদের রুটি এবং গলিয়াতের তলোয়ার নিয়ে যান (১ শমূয়েল ২১:১-৯)।
  • যোনাথন ও দায়ূদ একটি বন্ধুত্বের চুক্তি করেছেন, এই বিষয় শৌলের কর্মীরা তাকে জানান নি, এই বিষয়ে শৌল তাদের ধমক দেন। এমন কি শৌল বলেন যে, যোনাথন দায়ূদকে শৌলের বিরুদ্ধে উষ্কিয়ে দিয়েছেন (!)। শৌল এমন কর্মীদের লোভ দেখান যারা ন্যায্যতা ত্যাগ করে শৌলের ইচ্ছা বিস্তার করে (১ শমূয়েল ২২:১-১০)। যারা অন্ধভাবে তার প্রত্যেক আদেশে বাধ্য হয় না, তাদেরকে শৌল এখন তার বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্রকারী মনে করেন। তিনি মনে করেন যে, যোনাথন ও দায়ূদ তাকে খুন করতে চান এবং আরো মনে করেন, যে কোনো ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে কেনা যায়। শৌল সত্যে বা ন্যায্যতায় গুরুত্ব দেন, এখন থেকে তিনি তা ভানও আর করেন না।
  • শৌল যখন নোব শহরের ঘটনা শোনেন, তখন তিনি মহা পুরোহিত অহীমেলককে তার বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্রের দোষী বানান এই বলে যে, পরোহিত জেনে বুঝে দায়ূদের সাথে ষঢ়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন এবং তিনি বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র দান করেছেন।
  • অহীমেলক, যিনি দায়ূদের খুব সীমিত কথা থেকে টের পেয়েছিলেন যে, বড় ঝামেলা ঘটে যাচ্ছে, তিনি শৌলের কাছে সৎভাবে বলেন যে, তিনি কিছু জানতেন না এবং তারা দায়ূদকে সাহায্য করলেন যেমন তারা আগেও রাজার কর্মী বলে অনেক বার তাকে সাহায্য করেছিলেন (১ শমূয়েল ২২:১৪-১৫)।
  • যদিও শৌল এখানে দোষের প্রমাণ করতে সক্ষম নন, তিনি তাকে এই বলে বিচার করেন, তিনি শৌলকে কিছু জানান নি। এটা তো যেকোনোভাবে মৃত্যুর শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, তবুও শৌল তার রাগের কারণে নোবে উপস্থিত ৮৫জন পুরোহিতকে মেরে ফেলার আদেশ দেন। রাজা হিসাবে তার ন্যায় বিচারক হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তিনি এখানে বিচারক ভূমিকাকে একদম বিকৃত করে দেন।
  • যখন শৌল তার সেনাদেরকে পুরোহিতদের মেরে ফেলার আদেশ দেন, তারা প্রত্যাখান করে। শেষে শৌর দোয়েগ নামে একজন ইদোমীয় সুবিধাকারী দ্বারা পুরোহিতদের মেরে ফেলেন (১ শমূয়েল ২১:১৮-১৯)।
  • শৌল এখন সৈন্যকে ব্যবহার করে দায়ূদকে শিকার করার কাজে ব্যবহার করেন, অর্থাৎ তিনি রাজা হিসাবে সেনাদের নির্দোষ নাগরিকদের বিরুদ্ধে যেতে বলেন। দায়ূদ যদি প্রমাণিত অপরাধী হতেন, তবে তা হয়তো গ্রহণযোগ্য হত, কিন্তু এভাবে তা একদম নিষিদ্ধ।
  • শৌল এভাবে করতে থাকেন: যখন দায়ূদ কিয়ীলা শহরে আশ্রয় নেন (১ শমূয়েল ২৩:১-১৪), সীফ এলাকায় (১ শমূয়েল ২৩:১৫-২৯), ঐন-গদীতে (১ শমূয়েল ২৪) এবং আবারও সীফ এরাকায় লুকিয়ে থাকেন (১ শমূয়েল ২৬)।
  • সৈন্য দায়ূদকে ধরার কাজে ব্যস্ত ফলে ইস্রায়েলের সীমানাগুলো কম সেনা ও কম গুরুত্ব পায়। একারণে পলেষ্টীয়রা সুযোগ ধরে বিভিন্ন সামরিক অভিযান চালায় (১ শমূয়েল ২৩:১, ২৩:২৭)।
  • এই সময়ে দু’টি নামকরা গল্প ঘটে যেখানে দায়ূদ শৌলকে মেরে ফেলার সুযোগ আসে, কিন্তু দু’বার তিনি শৌলের বিরুদ্ধে হাত তোলেন না, যদিও তার নিজের সেনারা তা করার চাপ দেয়। এক গল্পে ঐন-গদী মরুএলাকায় একটি গুহায়ে ঘটে (দায়ূদ অন্ধকারে শৌলের চাদরের একটি টুকরা প্রমাণ হিসাবে কেটে দেয়) এবং অন্য গল্পে সিফ এলাকায় দায়ূদ রাতে শৌলের ছাউনিতে ঢুকে তার তোলয়ার চুরি করেন প্রমাণ করার জন্য যে, চাইলে তিনি শৌলকে সহজে মেরে ফেলতে পারতেন।
  • উভয় গল্পে দায়ূদ খোলামেলাভাবে (অথচ দূর থেকে) শৌলের সাথে যোগাযোগ করে বলেন “হে আমার পিতা, এই দেখুন, আমার হাতে আপনার পোশাকের একটা টুকরা … আমি আপনার বিরুদ্ধে কোন পাপ করি নি, কিন্তু আপনি আমাকে মেরে ফেলবার জন্য ওৎ পেতে আছেন। সদাপ্রভুই যেন আমার ও আপনার বিচার করেন এবং আমার প্রতি আপনি যে অন্যায় করেছেন তার প্রতিফল দেন; তবুও আমি আপনার বিরুদ্ধে হাত তুলব না” (১ শমূয়েল ২৪:১১-১২, একইভাবে ১ শমূয়েল ২৬:২১-১৫)।
  • দায়ূদের এই আচারণ শৌলের হৃদয় স্পর্শ করে, তিনি কান্না করে স্বীকার করেন যে, দায়ূদ তার চেয়ে ন্যায্য ও ধার্মিক, দায়ূদকে আশীর্বাদ করেন এবং তার নিশ্চয়তা প্রকাশ করেন যে, দায়ূদ অবশ্যই এক দিন রাজা হবেন। শৌল দায়ূদ থেকে শপথ চান যেন দায়ূদ তার পরিবার ও বংশধরদের উপর প্রতিশোধ না নেন (১ শমূয়েল ২৪:১৬-২২)। দায়ূদ তাকে শপথ করে নিশ্চয়তা দেন, যে তিনি পরে প্রতিশোধ নেবেন না।
  • শৌলের কথায় প্রকাশ পায় যে, তিনি এখনও চেতনার রব শুনতে পান এবং তার এখনও ভাল মন্দের একটি জ্ঞান আছে। তিনি সব কিছুর পিছনে ঈশ্বরের হাত দেখতে পান। কিন্তু যেমন এপর্যন্ত ঈশ্বরের রবের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন, তিনি – কিছু বিরতির পরে – ঠিক তাই আবারও করতে শুরু করবেন। পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, শৌলের ক্ষেত্রে তা ‘জানার অভাব’ নয়, বরং তা হল ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে নেওয়ার ও বাধ্য থাকার অভাব।
  • দায়ূদের দয়া দেখে শৌল অবশাই তার কথায় একরকম সৎ। কিন্তু তার কথা রক্ষা করার বা ঈশ্বরকে ভয় করার বা বাধ্যতার কোনো অভ্যাস নেই, তাই তার অনুতাপ স্থায়ী নয় এবং তার কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
  • দায়ূদ তা বুঝতে পারেন এবং শৌলের কথার পরেও মরু-এলাকায় বাস করতে থাকেন (১ শমূয়েল ২৪:২২, ২৬:২৫)। অবশেষে তিনি শৌল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্র পলেষ্টীয়দের মধ্য বাস করতে শুরু করেন (১ শমূয়েল ২৭-৩০)।
শৌলের মৃত্যু
  • পলেষ্টীয়েরা আবারও আক্রমণ করে বলে এই সময়ে শৌল ঈশ্বরের কাছ থেকে একটি বাণী বা পরিচালনা অত্যন্ত প্রয়োজন মনে করেন। শমূয়েল মারা গেছেন এবং “তিনি কি করবেন তা সদাপ্রভুর কাছে জানতে চাইলেন, কিন্তু সদাপ্রভু তাঁকে কোনভাবেই উত্তর দিলেন না-স্বপ্ন দিয়েও না, ঊরীম দিয়েও না কিম্বা নবীদের দিয়েও না” (১ শমূয়েল ২৮:৬)। কেন ঈশ্বর তাকে কোনো উত্তর দেন না? খুব সম্ভবত কারণ উত্তর দিলে বা না দিলে একই হয়ে দাঁড়ায়। শুরু থেকে শৌল একটির পর একটি বাণী অগ্রহ্য করে এসেছেন এবং তিনি ঈশ্বরের আইন-কানুনও পালন করেন নি।
  • শৌল তার হতাশায় এমন একজন মহিলার কাছে যান, যার মৃত লোকদের আত্মাদের সাথে কথাবার্তা হত (যদিও তিনি আগে এই ধরণের লোকদের ইস্রায়েল রাজ্য থেকে তাড়িয়েছিলেন, ১ শমূয়েল ২৮:৯)। তিনি মহিলাকে মৃত শমূয়েলের আত্মাকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে বলেন। তা আবারও এমন আচরণ, যা আইন-কানুনে একদম নিষিদ্ধ (লেবীয় ২০:২৭, দ্বিতীয় বিবারণ ১৮:১১)।
  • আত্মা জাতিয় কিছুটা প্রকৃতপক্ষে দেখা দেয়, কিন্তু তার কাছ থেকে নতুন কিছু জানা যাচ্ছে না (শমূয়েলের সময় শেষ)। তিনি মাত্র শোনেন যা তিনি ইতিমধ্যে গভীর হৃদয়ে জানেন, তার অবাধ্যতার কারণে ঈশ্বর তাকে রাজপদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।
  • মাত্র নতুন বিষয় হল (এবং তা আসলে সবাই বলতে পারত) যে, ইস্রায়েল পলেষ্টীয়দের দ্বারা পরাজিত হবে এবং শৌল ও তার ৩জন ছেলে এই যুদ্ধে মারা যাবে। কথাটি একদম গভীর আশাহীনতার, ঠিক সেই আশাহীনতা যা শৌল নিজের মন থেকে দূর করতে চেয়েছিল (১ শমূয়েল ২৮:১৬-১৯)।
  • পরবর্তী দিনে গিলবোয় পাহাড়ে যুদ্ধটি ঘটে এবং যোনাথন, অবিনাদব ও মল্কিশূয় (সবচেয়ে ছোট বাদে শৌলের সব ছেলেরা) যুদ্ধে মারা যায়। শৌল, আঘাতপ্রাপ্ত এবং – দেখে যে, তার ছেলেদের মেরে ফেলা হয়েছে – নিজের তলোয়ারের উপর পড়ে আত্ম-হত্যা করে (১ শমূয়েল ৩১:১-৪)।
  • পলেষ্টীয়রা তাকে ও তার ছেলেদেরকে শিরচ্ছেদ করে, তাদের বুকপাতাটা নিজেদের দেবতাদের মন্দিরে রাখে এবং লাশগুলো বৈথ-সান শহরে দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে দেয়।
  • যাবেশ-গিলিয়দের লোকেরা শৌলের সাহায্য ভুলে যায় নি এবং তারা খুব সাহস করে শৌল ও তার ছেলেদের লাশগুলো নিয়ে এসে তাদেরকে সম্মানের সঙ্গে কবর দেয় (১ শমূয়েল ৩১:১১-১৩)।
সারাংশ
  • কত ভাল শুরু পরে কত দুঃখের গল্প! শৌলের শুরুতে সব কিছু ছিল, ঈশ্বরের বাণী ও অভিষেক, নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিশেষ আত্মিক অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস-তৈরিকারী ঘটনা। তার শমূয়েলের সমর্থন ও ভালবাসা আছে এবং ঈশ্বর তাকে বিভিন্ন সংকটে অদ্ভুতভাবে জয় দান করেন।
  • কিন্তু সব কিছুর পরেও তার ভিত্তি দুর্বল। তিনি হীনম্যনতা ও জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিতে পারে না, প্রত্যেক চরম মুহূর্তে প্রমাণিত যে, তার প্রয়োজনীয় স্থিরতা, বাধ্যতা, ঈশ্বরের উপর নির্ভরতা, ভক্তিপূর্ণ ভয় ও দাঁড়ানোর শক্তি নেই।
  • যদিও ঈশ্বর বিভিন্নভাবে তার জীবনে হাতে দিতে থাকেন, বাণী, উৎসাহ, নিশ্চয়তা, অভিজ্ঞতা, সংশোধন, চেতনা ও মন ফিরানোর সুযোগ দিতে থাকেন, তবুও শৌল হাজার ছোট ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আস্তে আস্তে নিজের চরিত্র নষ্ট করেন। তিনি তার মন সন্দেহে, তুলনায়, হীনম্যনতায়, হিংসায়, প্রতিযোগিতায়, মিথ্যায়, ক্ষোভে, হিংস্রতায় ও দমনে দিয়ে দেন। তিনি ক্ষমতা ধরে রাখনে, যদিও তার ফলে তার জীবন, তার পরিবার ও তার দেশ ধ্বংস হয়ে যায়।
  • যদি তিনি শুধুমাত্র তার ছেলের মত ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে নিতেন, একজন যোগ্য অনুসরনকারীকে উন্নত করে দেশের নেতৃত্ব ধাপে ধাপে সুন্দরভাবে তার হাতে ছেড়ে দিতেন, তবে তার নিজের ছেলে একজন চমৎকার কর্মী বা সহ-রাজত্বকারী হিসাবে শান্তভাবে একটি শক্তিশালী ইস্রায়েলের উপরে রাজত্ব করতে পারতেন। স্বার্থপরতা সব কিছু নষ্ট করে দিল।